কবিতার পরিবারের একমাত্র ব্লগজিন

এখনও পর্যন্ত  Website counter  জন ব্লগটি দেখেছেন।
বিশেষ রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিশেষ রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

রবি শংকর স্মরণে - জাকির হোসেন

পন্ডিত রবি শংকর স্মরণে


উত্তর প্রদেশের বারানস কাঁদে !
বাংলাদেশের নড়াইলে তোমার পৈত্রিক নিবাস -
কালিয়া কাঁদে !
বিশ্বজুড়ে সুরের মূর্ছনায় বিষন্ন ব্যবধান ।
হটাত করেই তোমার শান্তিধামে গমন !
সমস্ত ভারত জুড়ে শোকের নীরবতা ।
বাংলাদেশ জুড়ে সংগীতপ্রেমীদের বেদনা ।
ভালবাসার তানপুরা-সেতার আর বাজবেনা !

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর হাত ধরে -
তোমার সাধনা, মনন, ইচ্ছে-বলয়,
দোসর-জনম তুমে পেলে শাস্ত্রীয় সংগীতে ।
মহাকবি ইকবালের কাব্য-সুরেও তোমার কীর্তি ।
স্মৃতিময় হলো 'পথের পাঁচালী', 'অপরাজিত' এবং
'অপুর সংসার' এর সঙ্গীতগুচ্ছ ।
চীরকাল তুমি অমর বাংলাদেশের হৃদয়ে !
লাল-সবুজ পতাকার ভালবাসায় ।
'ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ' -
তোমার মরণোত্তর উপহার ।
তোমার প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা ও
আজীবন সন্মাননা ।

তুমি নেই ! তবু আছ আমাদের হৃদয়ে !
বাংলাদেশের পরীক্ষিত অকৃত্রিম বন্ধু তুমি ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মানবাধিকার ও
'মানুষ মানুষের জন্য' - মানবতায় ছিলে তুমি ।
একদিকে-
বর্বর পাক-স্বৈরাচার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা,
বাংলার আকাশ-বাতাস কাঁদছে বারুদে !
লক্ষ লক্ষ শরণার্থী প্রতিবেশী ভারতে অমানবিক জীবনে,
ধর্ষিত হচ্ছে কত অজানা বীরঙ্গনা সে বাংলায় !
নদীর জলে লাশ ও রক্তস্রোত !
স্বাধীনতার জন্য বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ।
অন্যদিকে-
নিউইয়র্ক এর ম্যাডিসন-স্কয়ার-গার্ডেনে,
'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' ।
মানবতা ও অধিকার আদায়ের উত্সাহে -
তোমার সেতারে বাজলো 'বাংলার ধুন' ।
জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ' গানে,
বব-ডিলানের গিটারেও মানবতার সুর ।
বাংলার মুক্তিযুদ্ধ ও অসহায় শরণার্থীদের জন্য -
তোমার ও ভিনদেশী বন্ধুদের,
'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' ও আন্তর্জাতিক অনুদান ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরের জাদু তুমি ।
পশ্চিমা দেশে দেশে তোমার সেতারে মুগ্ধ কত শ্রোতা ।
যেন সমার্থক - তুমি ও ভারতীয় সঙ্গীত !
ভারত সরকার ও জনগনের অনন্য সন্মাননায় তুমি ।
'রাষ্ট্রপতি পদক', 'পদ্মভূষণ' ও 'ভারতরত্ন' ভূষণে তুমি ।
ভারতীয় রাজ্যসভার সন্মানিত সদস্যও ছিলে তুমি ।
তিন-তিনবার 'গ্রামি-অ্যাওয়ার্ড' জয়ে তুমি ।
ভিনদেশী কত 'সন্মানসূচক' উপাধিতেও তুমি !

তোমার পরস্পরা -
স্মৃতিময় অন্নুপুর্না দেবী, শু-জোন্স ও সুকন্যা কৈতান ।
তোমার উত্তরসুরী -
শুভেন্দ্র, আনুশকা শংকর ও নোরা-জোন্স ।
আপন সংস্কৃতি ও ঐতিয্য ধারণে ওরা প্রতিষ্ঠিত ।
তবুও ! এ যেন হটাত -
তোমাকে না পাওয়ার বেদনায় ওরা !
ওদের নীরব অশ্রুজল ও পিতৃহারা আর্তনাদ !

বিশ্ব-সংগীত জগতের কিংবদন্তী তুমি ।
কাঁদালে সেতারের মূর্ছনায় ! কাঁদালে বিশ্বকে !
প্রশান্ত, আটলান্টিক, আরব-পারস্য ও
ভারত মহাসাগরের শোকগাঁথায় তুমি ।
চিরন্তন, চীরসবুজ, শাস্ত্রীয় ও ধ্রুপদী পান্ডিত্যে তুমি ।
বঙ্গোপসাগর হতে জলকণা যাত্রায় -
মেঘের বন্ধুবেশে, হিমালয়ে শুভ্রতায় তুমি ।
তুমি রয়ে গেছো আজন্মলালিত সংগীতের প্রেমে !
মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসায় ।

হটাত তোমার শান্তিধামে যাত্রা !
তবুও সংগীতের মূর্ছনায়, সেতার-বীন-বাদ্যে,
বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে -
ইথারে সামাজিক যোগাযোগে, বন্ধু-সভায়
মানবতার প্রার্থনায়,
পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি সবার !
" চীর শান্তিময় হোক তোমার আত্মা,
তোমার পরিবারের প্রতি সমবেদনা "

চীরকাল তুমি রবে বিশ্ব-সংগীতের হৃদয়ে !
আগামী প্রজন্মের চেতনায়, উত্সাহে -
শান্তির শপথে, মানবতার জয়োগানে !
গর্বিত ভারত ও বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা নিবেদনে -
ধরনীর আকাশে সন্ধ্যাতারা রূপে !
কবিতায়, গানে - নতুন বাণী-চিরন্তনে

" সেতার যদি হয় অবিনশ্বর -
শুধু তুমিই সেথায়, পন্ডিত রবিশংকর "

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

সরদার ফারুক

বিশেষ রচনা

কবিতা লেখা


কখনো কখনো কবিতা লেখাকে আমার মাছ ধরার সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে হয় । আপনি ছিপ নিয়ে বসে আছেন পুকুরের পাশে । হয়তো অনেকক্ষণ পর একটু ফাৎনা নড়ে উঠলো , আপনি ছিপটা টান দিলেন - কিছুই উঠলোনা । চতুর মাছ টোপ খেয়ে পালিয়ে গেছে । অথবা কখনো দেখলেন আস্ত বড়শিটাই গায়েব - কাছিম কিংবা কাঁকড়ার কাজ । আপনি জানেন না , মাছ পাবেন কিনা , তবু ছিপ নিয়ে বসে থাকতেই হবে। মাঝে মাঝে আপনার মনে হতে পারে আপনি যেন কখনোই লেখেননি , অথবা আর কখনোই লিখতে পারবেন না । সে বড় কষ্টের কাল । আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে পৌঁছায় । তবে যারা চেষ্টা-কবি বা সেয়ানা কবি - তাদের কোন অসুবিধা নেই ।তারা যে কোন বিষয় ঠিক করে , আগে থেকে অভিধান থেকে কিছু শব্দ বের করে, নিয়মে সাজিয়ে কারখানার মতো উৎপাদন চালিয়ে যান । কবিকে থাকতে হয় অপেক্ষায় -কখন আসবে সেই বুনো হাওয়ার গোপন প্ররোচনা ,বেপরোয়া চিত্তবিকার! আমার মনে হয় খুব যুক্তিবাদী এবং সুস্হির লোকেদের জন্য কবিতা না। কবিতা কিছু যুক্তিহীন আবেগ ও বিশৃঙ্খলাকে ধারণ করতে চায় । সেয়ানারা জাগতিক সাফল্যও চায় ,আবার কবিখ্যাতিও চায় । চারপাশে তাই দেখবেন আমলা কবি , ব্যবসায়ী কবির ভিড়। স্তুতি , খ্যাতি ,পদক এদের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খায়। প্রকৃত কবির এসবের দরকার নেই। তার চাই আনন্দ -দিগ্বিজয়ী সম্রাটের আনন্দ ।

কারো কারো কাছে কবিতা লেখার পুরো বিষয়টাই একটা দুরারোগ্য ব্যাধি বলে মনে হয় - লোকনিন্দা , উপহাস যার একমাত্র পুরষ্কার ! হতে পারে , তবু অনেকেই এই অসুখ পুষে যাবে আমরন - ‘অসম্ভবের পায়ে’ মাথা কুটে মরবে। ধরা দাও, ধরা দাও ‘অধরা মাধুরী’ ছন্দোবন্ধনে!

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

সরদার ফারুক

ছন্দ নিয়ে কিছু সহজ কথা


শুরুতেই বলে রাখি এটা কোনও মৌলিক লেখা না , এবং অগ্রসর ছন্দচর্চাকারীদের জন্যও লেখা হয়নি ।

ছন্দের প্রয়োজনীয়তা

যদিও গদ্যছন্দ বলে একটা ছন্দ আছে , এবং সমর সেনসহ অনেক বিখ্যাত কবিই গদ্যছন্দে লিখেছেন , তবু আমি মনে করি ছন্দের প্রয়োজন কখনো ফুরোয়নি আর ফুরোবেও না ।কবিতায় আমরা যে দোলা বা স্পন্দের কথা বলি তা এই ছন্দ থেকেই আসে ।অনেকে ছন্দকে বন্ধন মনে করে বন্ধনমুক্তিতে বিশ্বাসী । তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি-রবীন্দ্রনাথ সেতারের উদাহরন দিয়েছিলেন । সেতারের তারের বন্ধনেই সুরের মুক্তি ।বন্ধনে মুক্তি অদ্ভুত শোনালেও চূড়ান্ত মুক্তি মানে বিশৃঙ্খলা । ছন্দে লিখুন বা না-ই লিখুন , জেনে রাখাটা দরকার । এটা কোনও আকাদেমিক আলোচনা না , কেবল একটা সহজ গাইড লাইন ।

৩ ধরনের ছন্দ

আপনারা নিশ্চয় জানেন বাংলা কবিতার ছন্দকে মোটামুটি তিন ধরনের বলে ধরে নেয়া হয় , অক্ষরবৃত্ত ,মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্ত ।মাত্রাবিচারের রীতিভেদে ছন্দও পাল্টে যায় ।

মাত্রা কাকে বলে ?

সোজা কথাই মাত্রা মানে পরিমাপক অর্থাৎ ইউনিট অফ মেজার ।জল মাপি লিটারে , কাপড় মাপি মিটারে আর ছন্দ মাপি মাত্রায় ।কবিতার এক - একটি পংক্তির মধ্যে যে ধ্বনিপ্রবাহ থাকে , এবং তাকে উচ্চারন করার জন্য মোট যে সময় আমরা নিয়ে থাকি , সেই উচ্চারনকালের ক্ষুদ্রতম এক-একটা অংশই হল মাত্রা । প্রবোধচন্দ্র সেন তারই নাম দিয়েছেন কলা । কলা মানে এখানে অংশ । ষোল কলায় যেভাবে চাঁদ পূর্ণ হয় , তেমনি কলা বা মাত্রার সমষ্টি দিয়ে তৈরি হয় পূর্ণ এক-একটি পংক্তি(লাইন) উচ্চারনকাল ।

কঠিন লাগছে ? আরো সোজা ভাবেই মাত্রাবিচারের পদ্ধতি নিচে আলোচনা করবো ।

অক্ষরবৃত্ত

বাংলা কবিতার খুবই বনেদি ছন্দ ।রবীন্দ্রনাথের আগে , রবীন্দ্র কাব্যের সূচনাপর্বেও বাংলা কবিতা প্রধানত অক্ষরবৃত্তেই লেখা হয়েছে , এবং বিস্ময়করভাবে এখন পর্যন্ত অক্ষরবৃত্ত তার শীর্ষ আসন ধরে রেখেছে ।

জীবনানন্দের গ্রণ্হভূক্ত কবিতার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশো ।এই মোট ৩৫২টি কবিতার ২৭৫টি অক্ষরবৃত্তে ,মাত্রাবৃত্তে ১৬টি , স্বরবৃত্তে ৩৭টি এবং গদ্যছন্দে ২৪টি ।ভেবে দেখুন !

আমার জানা মতে বিনয় মজুমদার তাঁর সমস্ত কবিতা অক্ষরবৃত্তে লিখেছেন (উনি অবশ্য পয়ার বলতেন ) । আমারতো মনে হয় , একজন কবি শুধু অক্ষরবৃত্তে লিখেই কবিজীবন পার করে দিতে পারেন ।

অক্ষরবৃত্তের মাত্রাগণনা

অক্ষরবৃত্তের লক্ষণ কী ?লক্ষণ মোটামুটি এই যে , এ ছন্দে যত অক্ষর বা বর্ণ , তত মাত্রা অর্থাৎ কিনা প্রতিটি অক্ষরই এখানে ১টি মাত্রার মর্যাদা পেয়ে থাকে , যেমন -

১/শ্যামল সুন্দর প্রভু কমললোচন (১৪ মাত্রা -গুণে দেখুন )
২/পোড়া প্রণয়ের বুঝি জরামৃত্যু নাই (১৪ মাত্রা )

বিনয় মজুমদারের সহজ ফর্মুলা-

“বাংলা অক্ষরের উপরে যে মাত্রা দেয়া আছে আমি তাকেই মাত্রা বলি ।যথা , ‘অ’ অক্ষরের উপরমাত্রা দেয়া আছে ,সুতরাং অ অক্ষরে একটি মাত্রা । ‘ত’ অক্ষরে মাত্রা দেয়া আছে সুতরাং ত অক্ষরে একটি মাত্রা । ‘স্ক’ ‘ল্ল’ ইত্যাদিতেও একটি মাত্রা ।অর্থাৎ অক্ষরবৃত্তে যুক্তাক্ষরেও একটিই মাত্রা ।‘ৎ’ তে মাত্রা নেই , তাই ‘উৎফুল্ল’ অক্ষরবৃত্তে ৩ মাত্রা , ‘হঠাৎ’ ২ মাত্রা ।তিনটি অক্ষরও যদি যুক্ত থাকে যেমন ‘উজ্জ্বলে’ –‘জ্জ্ব’ কে এক মাত্রা গণনা করে মোট ৩ মাত্রা হবে ।”

“ এটাই নির্ভুল ও প্রাথমিক নিয়ম । অবশ্য এর পরেও অল্প কিছু ছোটো নিয়ম আছে ।

স্বরবর্ণে ‘এ’ অক্ষরে , ‘ও’ অক্ষরে মাত্রা নেই । কিন্তু ‘এ’ অক্ষরে সর্বদাই এক মাত্রা ধরতে হবে , যেমন ‘এসো’ ২ মাত্রা ।‘এখন’ ৩ মাত্রা ।

‘ও’ অক্ষরে মাত্রা নেই । তবে অধিকাংশ শব্দেই ‘ও’ অক্ষরে একমাত্রা ধরতে হবে ।অল্প কয়েকটি শব্দে ‘ও’ অক্ষরে শূন্য মাত্রা । ‘ওঠ’ ২ মাত্রা , কিন্তু ‘হাওয়া’, ‘যাওয়া’ , ‘খাওয়া’ , ‘চাওয়া (অর্থাৎ- শব্দের শেষে ‘ওয়া’ থাকলে ) ‘ও’ শূন্য মাত্রা । এগুলোকে ২ মাত্রা বলেই গণ্য করতে হবে ।”

*( কেন করতে হবে সে বিশদ ব্যাখ্যাই না গিয়ে কেবল এই শব্দগুলো মনে রাখতে বলছি )

“এবার ব্যঞ্জনবর্ণ।ব্যঞ্জনবর্ণে প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘ঙ’ এবং ‘ৎ’ - এই দুটি অক্ষরের উপরে মাত্রা আঁকা হয়না ।বাঙ্ময় , কঙ্কাল, অঙ্ক এবং অনুরূপ সব শব্দে ‘ঙ’ অক্ষরের সঙ্গে অন্য অক্ষর যুক্ত হয়ে যুক্তাক্ষর তৈরি হবার ফলে এই যুক্তাক্ষরে এক মাত্রা ।অর্থাৎ ‘কঙ্কাল ‘ ৩ মাত্রা , ‘অঙ্ক’ ২ মাত্রা ।

তবে শব্দের শেষে ‘ঙ’ থাকলে ‘ঙ’ অক্ষরে সর্বদাই একমাত্রা ধরতে হবে । যেমন -‘রঙ’ ২ মাত্রা ।

‘ৎ’ শব্দের মাঝে থাকলে শূন্যমাত্রা । যেমন ‘উৎপ্রেক্ষা ’ ৩ মাত্রা । আবার শব্দের শেষে থাকলে ‘ৎ’ ১ মাত্রা দাবি করে , যেমন ‘প্রদোৎ’ ৩ মাত্রা , ‘হঠাৎ’ ৩ মাত্রা ।”

‘মাত্রা গণনার নিয়মাবলী এখানে সমাপ্ত । বাংলা অভিধানের এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার- এর অধিক শব্দগুলির মাত্রাগণনা এই অল্প কটি নিয়ম দিয়েই আমি সারা জীবন করেছি ।”

আমরা অক্ষরবৃত্তে মাত্রা গণনার নিয়ম আলোচনা করেছি ।এবারে একটি পংক্তিতে (লাইনে ) কয় মাত্রা বসানো যায় সেকথা বলছি ।অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চাল আসলে ৪ মাত্রার চাল । প্রতিটি পর্বে (অংশে ) থাকে ৪টি মাত্রা , শেষে থাকে ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।সোজা কথায় অক্ষরবৃত্তে মাত্রাসংখ্যার ফর্মুলা হচ্ছে ৪ এর গুণিতক +২ ।

যেমন :
৪ x ১ +২ = ৬
৪ x ২ + ২ = ১০
৪ x ৩ + ২ = ১৪

এই নিয়মে ১৮, ২২ , ২৬ , ৩০ এভাবে মাত্রাসংখ্যা হতে পারে ।অবশ্য অত বড়ো লাইন কেবল জীবনানন্দ দাশই লিখে গেছেন ।

*৬ মাত্রার পংক্তি ভেঙে দেখাই --

খেলাঘর/ভাঙে
ঝড়ের আ/ঘাতে ।

*১০ মাত্রা ভেঙে দেখাই --

মুখ নেই,/লোভ ফুটে/ আছে ;
শিকারীর /সহজ উ/দ্যম
নিরঙ্কুশ /সফলতা / আছে ।

( উদাহরনগুলো এই অকবির রচনা বলে ভাল নাও লাগতে পারে )

*১৪ মাত্রা ভেঙে দেখাচ্ছি --

সহসাই / ফুঁসে ওঠে /কুলীন গো/ক্ষুর
অন্ধ রোষে /বিষ ঢালে/ নরম মা/টিতে ।

• ১৮ মাত্রার উদাহরন---

বজ্রের উ/ল্লাসে খোলে/বৃক্ষদের/তৃষ্ণার দ/রোজা ।

*২২ মাত্রার উদাহরন বিনয় মজুমদারের কবিতা থেকে --

সুদূর স/মূদ্রজলে/ একটি গী/টার ভেসে/চলেছে এ/খন
যখন স/কলে ডুবে/ নিশ্চিহ্ন হ/য়েছে /সব হারিয়ে গি/য়েছে ।

আর উদাহরন বাড়াবো না ।আপনারা ২৬ মাত্রা এমনকি ৩০ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে নিজেরাই খুঁজে বের করুন ।

আরো কিছু জরুরী কৌশল

এভাবে ৪ মাত্রা করে লিখতে গেলে পাগল হয়ে যাবেন । তাই সহজ কায়দা হলো-দুটো মহাপর্বে লাইনটাকে ভাগ করে নেয়া ।প্রথম মহাপর্বে থাকবে ৮মাত্রা , বাকি মাত্রাগুলো পরের মহাপর্বে ।অর্থাৎ ভাঙতে হবে নিচের নিয়মে ।

(*৬ মাত্রা এভাবে ভাঙার কিছু নেই )

১০ মাত্রা=৮+২
১৪ মাত্রা= ৮+৬
১৮ মাত্রা+৮+১০
২২ মাত্রা=৮+১৪

এইভাবে বাকিগুলো আপনারা ভেঙে নিন ।
এই নিয়মে ভাঙলে লাইনের নতুন চেহারা হবে--

সম্রাজ্ঞীর মতো চোখে/তার খেলা করে
অযুত গোলাপ , আর/ পাতক কীটেরা
কুরে কুরে খায় সেই /চোখের ঐশ্বর্য
তীব্র হিমে ক্ষয়ে যায়/ফুলের প্রতিভা ।
(অধমের অক্ষম কবিতাকে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। )

এরপরে সবচে’ জরুরী কথা হচ্ছে , প্রথম ৮ মাত্রার মহাপর্বকে না ভাঙার চেষ্টা করবেন । যেমন এভাবে ভাঙবেন না --
তোমাদের এখানে পা/হাড়ী ঝর্ণা আছে ?

*এভাবে ভাঙলে একবারে অশুদ্ধ হবেনা , তবে পাঠকের পড়তে কষ্ট হবে । তাই যতটা সম্ভব ৮ মাত্রার প্রথম মহাপর্বকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেষ্টা করবেন ।

অক্ষরবৃত্তের আরো কিছু নিয়ম
শব্দের পরে শব্দ গাঁথারও একটা নিয়ম আছে ।ছন্দের জাদুকর নামে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একটা সোজা কথা বলে দিয়েছেন -- বিজোড়ে বিজোড় গাঁথো , জোড়ে গাঁথো জোড় । অর্থাৎ বিজোড় শব্দের সাথে বিজোড় শব্দ এবং জোড় শব্দের সাথে জোড় শব্দ ব্যবহার করবেন ।কেন করবেন ? কারন তাহলে পাঠকের কান আহত হয়না ।

কখনো নিচের নিয়মে সাজাবেন না--
৩+২+৩ , ৫+২+১ ,২+৩+৩ ,কেউ কেউ অবশ্য ৫+৩ ও নিষেধ করেন ।অবশ্য ৩+৫ ঠিক আছে ।
আপাতত অক্ষরবৃত্তের নিয়মের আলোচনা এখানেই শেষ করছি । এটুকু আস্তে আস্তে অনুশীলন করুন ।অল্প কিছু কথা বাকি কিস্তিতে দিয়ে দেবো ।অবশ্য এই আলোচনাটুকুও আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় ।

জরুরী একটা ভুলে বসে আছি । এখন অক্ষরবৃত্ত বেশির ভাগই অমিল মুক্তকে লেখা হয় ।অমিল তো বুঝতেই পারছেন অন্ত্যমিল নেই (অবশ্য অন্ত্যমিলেও দারুণ কবিতা লেখা যায় ) , আর মুক্তক মানে বিভিন্ন লাইনের বিভিন্ন দৈর্ঘ্য হতে পারে একই কবিতায় ।যেমন এক লাইনে ১৪ আবার পরের লাইনে ১০ ,তারপর আবার ৬ কিংবা ১৮ , কবির প্রয়োজনে ।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ

ভূমিকা:
বন্ধুরা , আমরা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে আলোচনা মোটামুটি শেষ করেছি । এবারে আমরা মাত্রাবৃত্ত নিয়ে কথা বলবো ।প্রথমেই বলে নেই , এই পদ্ধতি অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির থেকে ভিন্নতর । কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছন্দ শেখার যে সহজ ফর্মুলা দিয়েছেন - তা থেকেই মূলত আমি আমার মতো করে সংক্ষেপে মাত্রাবৃত্তের নিয়মগুলো তুলে দিচ্ছি । তবে এ ও বলে রাখি - স্বরবৃত্ত ছন্দের ক্ষেত্রে কিন্তু এইসব সহজ ফর্মুলায় চলবেনা , সেক্ষেত্রে সিলেবল বা দল ( মুক্তদল ও রুদ্ধদল)দিয়েই মাত্রার হিসাব করতে হবে । ওখানে আর অক্ষর দিয়ে হিসাবের সহজ কায়দা চলবেনা ।সিলেবল হচ্ছে উচ্চারণের এক-একটি ইউনিট বা একক ।অর্থাৎ স্বরবৃত্তে আর চোখের হিসাব চলবেনা , কানের বিচারে চলতে হবে বেশি করে ।

আমি সহজ ফর্মুলার লোক , তাই মাত্রাবৃত্ত পর্যন্ত গিয়েই থেমে যাব । স্বরবৃত্ত নিয়ে যেহেতু নতুন কায়দা খুঁজে পাইনি , সেহেতু ওটা নিয়ে আপাতত আলচনা করছি না। আমার উদ্দেশ্য নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ? বাংলা কবিতার প্রধান ৩ ছন্দের মধ্যে যদি ২টি ছন্দের সোজা পদ্ধতি যদি আমরা জেনে নিতে পারি , আর কী চাই ?

বাংলা কবিতার সিংহভাগ এখনো এই দুটো ছন্দেই লেখা হয় । ছড়ার ছন্দটি স্বরবৃত্তেরওটা আপাতত আলচনা করছি না - তবে স্বরবৃত্তে জীবনানন্দ দাশসহ অনেক কবিই সার্থক কবিতা লিখেছেন । যাহোক , আমি নিজে অবশ্য একটাও লিখিনি ।

মাত্রাবৃত্তে মাত্রা গণনা :
অক্ষরবৃত্তে আমরা মোটের ওপর(কিছু ব্যতিক্রম আগেই উল্লেখ করেছি)যত অক্ষর তত মাত্রা এই ফর্মুলায় চলেছি । যুক্তাক্ষরকেও এখানে আমরা ১ মাত্রা দিয়েছি ।তবে মাত্রাবৃত্তে যুক্তাক্ষরকে কিন্তু পূর্ণ মূল্য দিতে হবে , অর্থাৎ ২ মাত্রা দিতে হবে ।অনেকেই তাই মাত্রাবৃত্তকে ‘যুক্তাক্ষর ভাঙা ছন্দ ’ বলে অভিহিত করেন ।একটা উদাহরন দেই--‘কষ্ট ’ শব্দটি অক্ষরবৃত্তে ২ মাত্রা , কিন্তু মাত্রাবৃত্তে ভেঙে গিয়ে হবে ‘ ক ষ্ ট ’ - ৩ মাত্রা ।বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয় ? আরেকটা বলি - ‘ছন্দ’ অক্ষরবৃত্তে ২ মাত্রা , আর মাত্রাবৃত্তে ৩ মাত্রা (ছ ন্ দ ) ।

তবে এখানেও একটা ব্যতিক্রম মনে রাখতে হবে । তা হচ্ছে শব্দের প্রথমে কোন যুক্তাক্ষর থাকলে সেটা ভাঙা সম্ভব নয় , সে কারনে মাত্রাবৃত্তেও সে ১ মাত্রাই পাবে । বোঝেন নি ? ধরুন ‘ক্লাস’ শব্দটি । এটি কিন্তু অক্ষরবৃত্ত , মাত্রাবৃত্ত দুই ছন্দেই ২ মাত্রা পাবে । কারন শব্দের শুরুতেই যুক্তাক্ষর ‘ক্ল’ কে ভাঙা যাচ্ছেনা ।

তাহলে সোজা কথায় আমরা জানলাম - শব্দের মাঝখানে অথবা শেষের যুক্তাক্ষরকে আমরা মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রার মর্যাদা দেব , আবারও বলি শব্দের প্রথমে যুক্তাক্ষর থাকলে ১ মাত্রা-ই দেব ।

রবীন্দ্রনাথই এই ছন্দের স্রষ্টা । ‘মানসী’ পর্বের কবিতা থেকেই এই ছন্দের সূচনা । ‘মানসী’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন , “ আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নূতন শক্তি দিতে পেরেছি।” বোঝাই যায় , এখানে পূর্ণ মূল্য বলতে ২ মাত্রার মূল্য ।

যুক্তাক্ষরের বাড়তি বোঝা নিয়ে অক্ষরবৃত্ত যদি হাতির চালে চলে , মাত্রাবৃত্ত চলে তেজী ঘোড়ার মতো ।
অক্ষরবৃত্ত জোড়া দিতে চায় , মাত্রাবৃত্ত চায় ভাঙতে ।

মাত্রাবৃত্তের নানারকম চাল
আমরা অক্ষরবৃত্তকে দেখেছি ৪ এর চালে চলতে ।এর লাইন তৈরি করেছি ৪ এর গুণিতক + ২ দিয়ে ।এখানে মাত্রাসংখ্যা সব সময় আমরা ৪ যোগ করে বাড়িয়েছি , যেমন ,৬ ,১০ ,১৪, ১৮,২২ - মনে আছে নিশ্চয় ?কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন ওখানে আবার +২ কেন বাপু ?এরও কারন আছে , ছন্দোগুরুরা এম্নি এম্নি এই বাড়তি ২মাত্রা সবখানে রাখেননি ।কবিতা পড়তে পড়তে একটু দম ফেলার অবকাশ চাই, একটানা ছুটতে গেলে নাভিশ্বাস উঠে যেত ।ঐ ২ মাত্রাতেই সেই দম ফেলার জায়গা ।

বাড়তি ২ মাত্রা না থাকলে এ রকম হতো :
বাজে লক্ষ ঢাকঢোল
চতুর্দিকে হট্টগোল ।
আর সহ্য হয় কত ,
প্রাণ হল ওষ্ঠাগত ।
ভক্তেরা বিষম খান ,
দলে দলে মূর্ছা যান ।

--দাঁড়ি-কমা থাকা সত্ত্বেও লাইনের শেষে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা । ছন্দের তাড়না প্রবল হয়ে পাঠককে পাগলের মতো ছুটিয়ে মারছে ।

অক্ষরবৃত্তের চাল কেবল ৪ মাত্রার চাল , তবে মাত্রাবৃত্তের চাল কিন্তু এক ধরনের নয় । হ্যাঁ , মাত্রাবৃত্ত নানান চালে চলে ।
এখানে অক্ষরবৃত্তের মতো ৪ মাত্রার চালের পাশাপাশি ৫ মাত্রার চাল , ৬ মাত্রার চাল , আর ৭ মাত্রার চাল আছে ।
লাইনের এক-একটা অংশে বা পর্বে মাত্রাসংখ্যা দিয়েই আমরা বিচার করবো , কোনটা কত মাত্রার চাল ।কঠিন লাগছে ? আরে ভাই , উদাহরন দিতে শুরু করলে দেখবেন পানির মতো !

মাত্রাবৃত্তে ৪ মাত্রার চাল একটা বানিয়ে ফেলি ---

নির্জন রাত্রিতে কাকে তুমি ডাকো ?
কান্নার জল দিয়ে কার ছবি আঁকো !

ভেঙে দেখাই---
নির্জন/রাত্রিতে/কাকে তুমি/ডাকো ?
কান্নার/জল দিয়ে/ কার ছবি/আঁকো?

(ইসরে , কাঁচা পদ্য একেবারে ! যাক বাপু ছন্দ বোঝা গেলেই চলে । এখানে নির্জন =নি র্ জ ন , রাত্রিতে=রা ত্ রি তে ,কান্নার=কা ন্ না র )

*এখানে কী দেখছি ? ৩ টে করে ৪ মাত্রার পর্ব(অংশ) প্রত্যেক লাইনে , শেষে একটা ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।ভাঙা বলছি এ জন্য যে , এটি ৪ মাত্রার তো আর নয় ।

যাহোক , মাত্রাবৃত্তে এই ভাঙা পর্ব আপনি রাখতেও পারেন , নাও পারেন । ভাঙা পর্বের মাত্রাসংখ্যা ১, ,২ বা ৩ - আপনার ইচ্ছেমতো রাখতে পারেন ।

আরেকটা উদাহরন তৈরি করা যাক --
অস্ফুটে বলেছে সে কী ,
আমি তার কিছু শুনিনি ।

*ভেঙে দেখি চেহারাটা--
অস্ফুটে/বলেছে সে/ কী ,
আমি তার /কিছু শুনি/নি

** অস্ফুটে ( অ স্ ফু টে - ৪ মাত্রা )।এখানে দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক লাইনে ২টা করে ৪ মাত্রার পর্ব ,আর একটি করে ১ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।

তাহলে বোঝা গেল প্রতি লাইনে পর্বের সংখ্যা আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে ।ভাঙা পর্বেও বৈচিত্র্য আনতে পারেন । ইচ্ছে করলে প্রতিটি লাইন শেষে একই মাত্রার আবার ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ভাঙা পর্ব রাখতে পারেন ( ১,২,৩ ) ,আবার না ও রাখতে পারেন ।

আর একটা কথা - অন্ত্যমিল রাখা না রাখাও কিন্তু আপনার ব্যাপার ।

মাত্রাবৃত্তে ৫ মাত্রার ছন্দ

এবারে ৫ মাত্রার কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া যাক -

তোমার চোখে কিসের ছায়া গভীর কালো ?
ছিন্ন পাতা ঝরে পড়ছে হাওয়ার হাতে ;
কোথাও যেন মেঘ জমেছে বিষণ্নতার
কেউ জানেনা কারনটা কী মন খারাপের ।

পর্ব হিসাবে ভাঙলে এ রকম দাঁড়াবে :

তোমার চোখে/ কিসের ছায়া/ গভীর কালো ?
ছিন্ন পাতা/ ঝরে পড়ছে/ হাওয়ার হা/তে ;
কোথাও যেন/ মেঘ জমেছে/ বিষণ্নতা/র
কেউ জানেনা/ কারনটা কী/ মন খারাপে/র ।

* প্রতি লাইনে ৫ মাত্রার ৩টি করে পর্ব । প্রথম লাইনে ভাঙা পর্ব নেই ।অন্যগুলোতে ১ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।(ছিন্ন = ছি ন্ ন /৩ মাত্রা , বিষণ্নতা= বি ষ ণ্ ন তা/৫ মাত্রা )।

এই দুর্বল কবিতায় মন না ভরলে ভাল একটা কবিতা দেই :
আসতে-যেতে এখনো তুলি চোখ
রেলিঙে আর দেখিনা নীল শাড়ি ।
কোথায় যেন জমেছে কিছু শোক ,
ভেঙেছ খেলা সহসা দিয়ে আড়ি ।
এখন সব স্তব্ধ নিরালোক ;
অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে বাড়ি ।
---নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।

ভেঙে দেখালে---
আসতে-যেতে/ এখনো তুলি/ চোখ
রেলিঙে আর/ দেখিনা নীল/ শাড়ি ।
কোথায় যেন/ জমেছে কিছু/ শোক ,
ভেঙেছ খেলা/ সহসা দিয়ে/ আড়ি ।
এখন সব/ স্তব্ধ নিরা/লোক ;
অন্ধকারে /ঘুমিয়ে আছে/ বাড়ি ।

*দুটো করে ৫ মাত্রার পর্ব সাথে ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।

আগেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে আমরা ঘোড়ার চালের সাথে তুলনা করেছি ।আপনারা সবাই নিশ্চয় অশ্বখুরধ্বনি শুনেছেন ? ৪ মাত্রার চাল এর ধ্বনি যদি হয় খট্ খট্,খট্ ,খট্ ; ৫ মাত্রার ধ্বনি তবে খটাশ খট্ , খটাশ খট্ ।অন্য কথায় বলা যায় - বেজোড় জোড় , বেজোড় জোড় । মাঝে মাঝে অবশ্য জোড়-বেজোড় হয়ে গেলে তেমন কিছু দোষের নয় ।

মাত্রাবৃত্তে ৬ মাত্রার ছন্দ
উদাহরন দেয়া যাক :
খেলার মধ্যে ভুল হলে আর নতুন খেলার
সুযোগ তো নেই ।তলিয়ে যাচ্ছো ভুল আবর্তে ,
আসবেনা কেউ অন্ধকারের অতল গুহায় ।

*খুব একটা সুবিধার হলনা । তবু এখানে দুটো বিষয় দেখাচ্ছি -১/ ভাঙা পর্ব রাখিনি ,২/অন্ত্যমিল রাখিনি ।ভেঙে দেখাবো না কি আপনারাই ভেঙে দেখবেন ?

আরেকটা উদাহরন দেই । এবারে নীরেন্দ্রনাথ থেকে :
যন্ত্রণা থেকে আনন্দ জেগে ওঠে
শোক সান্ত্বনা হয় ;
কাঁটার ঊর্ধ্বে গোলাপের মতো ফোটে
সমস্ত পরাজয় ।

ভাঙলে ---
যন্ত্রণা থেকে/ আনন্দ জেগে/ ওঠে
শোক সান্ত্বনা/ হয় ;
কাঁটার ঊর্ধ্বে/ গোলাপের মতো/ ফোটে
সমস্ত পরা/জয় ।

* এখানে দেখলাম সব লাইনে পর্বসংখ্যা সমান নয় । প্রথম আর ৩য় লাইনে ২টি করে পর্ব , কিন্তু ২য় আর ৪র্থ লাইনে ১টি করে পর্ব । আবার অন্ত্যমিলেও বৈচিত্র্য -১ম-৩য় ,২য়- ৪র্থ । ভাঙা পর্ব অবশ্য সবখানেই ২ মাত্রার ।পর্বসংখ্যায় এই বৈবিচিত্র্যের নিরীক্ষাটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের আগেই শুরু করেন কবি বিষ্ণু দে ।

৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত
এটা শেষ করতে পারলে এই যাত্রা বেঁচে যাই ।

৪ ,৫ ,৬ মাত্রার তুলনায় ৭ মাত্রায় লেখা কবিতার সংখ্যা খুব কম ।রবীন্দ্রনাথের পরেও অনেকে ৭ মাত্রায় লিখেছেন , তবে আজকাল তেমন একটা দেখিনা ।

একটা উদাহরন দিয়েই কেটে পড়বো :
কে যেন বারেবারে তার
পুরনো নাম ধরে ডাকে ;
বেড়ায় পায়েপায়ে , আর
কাঁধের পরে হাত রাখে ।

ভাঙলে এ রকম --
কে যেন বারেবারে/ তার
পুরনো নাম ধরে /ডাকে ;
বেড়ায় পায়েপায়ে ,/ আর
কাঁধের পরে হাত/ রাখে ।

আপাতত এখানেই শেষ করছি । এরপরে সময় পেলে ছন্দের নানারকম নিরীক্ষা নিয়ে আলোচনার ইচ্ছে আছে । যারা বিষয়গুলো আরও ভালভাবে জানেন , তাঁদের অংশগ্রহণে আরও শিখতে পারবো আশা করি ।

সহায়ক গ্রন্থ -
১। কবিতার ক্লাস - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২। ছন্দের বারান্দা- শঙ্খ ঘোষ
৩। ঈশ্বরীর স্বরচিত ও অন্যান্য নিবন্ধ - বিনয় মজুমদার

অমলেন্দু চন্দ

একটি কাব্যনাট্য – একটি প্রয়াস


[ইডেনের পটভুমি। এ পর্যায়ে চরিত্রেরা ইভ ও আদম।  সময় – ধরা যাক এক অসময়। নিউ টেস্টামেন্ট অনুযায়ী কেইন ও আবেল ছিল আদম ও ইভের দুই সন্তান। কেইন বড়, আবেল ছোট। গল্প দীর্ঘ না করে বলি - কেইন তার ছোট ভাই আবেল কে হত্যা করেছিল , সিব্লিং রাইভ্যালরি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল যে সেটা হেট্রেড বা গভীর ঘৃণায় পর্যবসিত হয়েছিল, এবং একদিন রাগের মাথায় কেইন আবেল কে মেরে ফেলে – দুজনেই তখন যৌবনের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে মানে উনিশ কুড়ি আর কি। এইসব ঘটনা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে ধরা যাক আদম ও ইভ আজকের সময়ের বিথানে এসে দাঁড়িয়ে কথা বলছে – দেখি এখানে!]

ইভ – ইডেনের নিঃসঙ্গতা বয়ে বেরান ক্লান্তিকর, অতএব ...
আদম - কিন্তু সঙ্গম মানেই সৃষ্টি। যে সৃষ্টি আরও কিছু পাপের মতই মনে হয়! অথচ এ পাপ বয়ে বেরাতেই হবে মানুষকে...

ইভ - পাপ ছাড়া সুন্দরের সৃষ্টি হয় না বোধহয়। তাই নিষিদ্ধ ফল আমাকে খেতে হয়েছিল। ফলশ্রুতি পৃথিবীতে নির্বাসন। কিন্তু সে নির্বাসন তো আঁধারে নয়, তাই আলো ছিল, ছিল শব্দ, কথা। বীজমন্ত্রের মত সব শব্দ। ঋষি পরাশর সত্যবতীর সাথে সঙ্গমে পরিতৃপ্ত হল কুয়াশার অঙ্গনে। এল বেদব্যাস। যশোদার কোলে এল সেই সাগ্নিক শিশু। কদমতলায় তোমার হাতে বাঁশী, আমার কাঁখে কলস।

আদম - তারপর কুরুক্ষেত্র

ইভ - সে ক্ষেত্রে ক্লান্তি এল একসময়, তারপর দ্বৈপায়নে বিশ্রাম। অন্যদিকে চেয়ে দেখো, মোজেজ এল, স্বপ্ন দেখাল শহর গড়ার।

আদম – তবুও তো পাপের ইথার রয়েই গেল, এল অপ্সরারা, কিম্বা মধ্যযুগীয় হারেমের পরী,
বা আজকের অলম্বুষা নগরনাগরী –

ইভ - তবুও আবার চেতনা বিশুদ্ধ হল নক্ষত্রের আলোয়। তারারা বলে দিল যীশুর জন্মের কথা। বেথেলহেমের আস্তাবলে। তুমি স্বাগত জানালে তিনজন জ্ঞ্যানী পুরুষকে

আদম - হ্যাঁ, যীশু এল, সঙ্গে এল জুডাস। ক্রুশ রক্তে লাল হল। সময় পেরিয়ে গেল। আইন্সটাইন, ফারমি আইজেনহাওয়ার এল। এল অনু পরমানু বিক্রিয়া। হিরোশিমার কান্না শুনেছ তুমি তারপর। গ্রাম শহর হল, জন্ম দিল বস্তির – অবহেলিত জারজের মত। লিঙ্কন মুমূর্ষু হয়ে গেল, মারক্স এল, ঈশ্বরের মৃত্যু সংবাদ ছাপা হল বুলেতিনে, কিন্তু কি হল তাতে –

ইভ - তবুও মন্দির রয়ে গেল, রয়ে গেল গির্জা মসজিদ সিনাগগ। প্রদীপ মোমবাতি চেরাগ
জ্বলছে নিবছে আবার জ্বলছে। এক আশ্চর্য স্বভাবের ঘেরে মানুষ লালিত হল –

আদম – যাপনের আভঙ্গে এল ধুল আর ধোঁয়াশার অন্ধকার। জীবাণুতে ছেয়ে গেল সভ্যতা।
ফুসফুসে ইদুরের গর্ত, অন্ত্রে ঘা, কোষে ক্লান্তি। জরায়ুতে ভ্রুন হত্যার পীঠস্থান । পতিতালয় বুভুক্ষা বিক্ষোভ বলাৎকার – এ তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পাপের পুনরাবৃত্তি। আমাদের হৃদয়ে হৃদয় নেই, হৃদপিণ্ডে হৃদরোগ জবরদখলী...

ইভ - হ্যাঁ, একচক্ষু হরিনের মত বাঁচার অভিনয়ে তুমি ভুলে গেলে মৃত্যুকেও। অথবা তুমি মরতে পারলে না কারন তুমি বাচতেই শেখনি। চেয়ে দেখলেনা তুমি উদবাস্তুর চোখের জলে পথ পেছল হয়ে গেল, দেশভাগ হলে পরে। ঘর তাঁবু হয়ে গেল। তবুও মানুষ উটের পা নিয়ে মরুজয় করে এল। কেন বুঝলেনা তুমি যে নারকেলের ছোবড়ায় ফাঁদ তৈরি হয়, সে দিয়ে শিশুর দোলনা বানানো হল ।

আদম - কোথায় দাঁড়াতে হবে শেষতক, সেই তো সারে তিন হাত ভরসা

ইভ - মানুষের কি শেষ আছে। সভ্যতার আগুনে মানুষের সমস্ত পাপ ফিনিস্কের মত পুনর্জন্ম পায়। তবুও মনের পাঁকেই অভিলাষের পদ্ম পবিত্র আলোর মুখ দেখে। সে অভিলাষের অঙ্গনে জর্ডন নীল নদ হতে চায় কিম্বা নীল নদ পলি কাঁপা গঙ্গা। সে ইচ্ছার জ্যোৎস্নায় রাম আর রবার্ট কোরান নিয়ে টানাটানি করে, আবার গীতা নিয়ে মগ্ন থাকে রহিম। আজও প্রতিটি মায়ের দুধের মত সব শিশুর হাঁসি উষ্ণ মিষ্টি। এক হাঁটু জলে কিষান আজও বিজধান পোঁতে। বাবুই খড় কুটো ঘাস নিয়ে ঘর বাঁধে।

আদম - কিন্তুর কয়েদি আমরা সবাই – উত্তরের ভিটেতে বাস্তু নেই, বাঁশবন ভরে গেছে।

ইভ - আদম, সব পথ মানুষের পায়ের তোলায় সুখী হতে চায় একটিবার। প্রাপ্তি শুধু পথের অন্তে নয় পথের প্রান্তেও থাকে।

আদম - কোথায় শুরুর শেষ কোথায় শেষের শুরু , আলম্বহীন এই ঝুলে থাকা সত্ত্বার উৎসব নিরাময়হীন এক বিবর্ণ চেতনা

ইভ - শূন্য তবু শূন্য নয়, ঈশ্বরীবর্ষার জল ভরে নাও বিশালাক্ষ চোখে। যন্ত্রণার মেঘ যদি জমে, পুঞ্জীভুত হতে দিও, প্রত্যয়কে করে দিও পাহাড়ি দেওয়াল, দেখবে অন্দর মরু চেরা পুঞ্জী হবেই নিশ্চয়।

[ কৃতজ্ঞতা স্বীকার – আমার জীবনের কিছু অনন্য উপস্থতির কাছে] 
[ চলবে ]

সরদার ফারুক

এবারের ম্যানিফেস্টোঃকবিতা নিয়ে কিছু কথা

বাস্তবে এই প্রশ্নটা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে । বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সুবিধে নিয়ে এবং খুব জনপ্রিয় সোসাল সাইট গুলোর কল্যানে মানুষ এত কবিতা লিখছেন - পড়ছেন - ভাবছেন যে মনে প্রশ্নের চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে কেমন কবিতা আমরা পছন্দ করি ? কী রকম হওয়া উচিত কবিতার শরীর ? এই প্রশ্নগুলো সবাইকে ভাবায় । অনেকদিন হ’ল আধুনিক কবিতার মৃত্যু ঘোষণা করে এসেছে পোস্টমডার্ন কবিতা । বিনির্মাণ ,বিমানবিকীকরণও এখন পুরোনো হয়ে গেছে , তবু পাশ্চাত্যের নানা কাব্য আন্দোলনে আমরা এখনো আলোড়িত হই , চলে অন্ধ অনুকরণেরও মহড়া ।

কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । মানুষের মৌল আবেগগুলো চিরন্তন , যদিও সমস্যাগুলোর চেহারা বদলায় - নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব ঘটে । প্রকরণ ও প্রকাশভঙ্গিতেই সবচে’ বেশি পরিবর্তন লক্ষ করা যায় ।পরিবর্তন যাই হোক - আমাদের পর্যবেক্ষনে কবিতা ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে ।হাজারো কবিযশোপ্রার্থীর অবিরল সাধনা সত্ত্বেও পাঠক কেবল দূরে সরে যাচ্ছে । কবিতার বই ছাপানোর কথা শুনলে প্রকাশক আঁতকে ওঠেন ।তবু নিজের খরচে অসংখ্য বই বেরুচ্ছে , আর কবিরা দেদার সেসব বই পরিচিতজনদের বিলিয়ে দিচ্ছেন ।

আমরা জানি , অগ্রসর কবিতাপাঠে পাঠকের যে যোগ্যতা অর্জন আবশ্যক , সে যোগ্যতা এদেশের তথাকথিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিরল - তবু প্রকৃত পাঠকদের অনেকেও কবিতা পাঠ থেকে আনন্দ নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলেই মনে হয় ।

পাশ্চাত্য কবিতা ভাবনা থেকে আমরা অনেক কিছুই সার্থক ভাবে নিয়েছি ।ফল্ট (চ্যুতি), এসট্রেঞ্জমেন্ট (অপরিচিতিকরন ) শিল্পের ব্যাপ্তি ঘটিয়েছে ।তবু ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে বর্ণিত - ‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য’ এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। কবিতা কি আজ তার রস হারাচ্ছে ? কবিতার শরীর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ছবি ও সঙ্গীত ,হারিয়ে যাচ্ছে গন্ধ , বর্ণ , স্পর্শ সহ অন্যান্য সংবেদন? নানা নিরীক্ষার ফলে এক ধরনের চিন্তার উল্লম্ফনকে কবিতা বলে অভিহিত করা হলেও, সেগুলো পাঠককে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ।

কবিতা কোনো নির্দেশনা মানে না,তবু কয়েকটি বিষয় আমরা সবাইকে ভেবে দেখতে বলি -
১/ কবিতায় ছবি, সঙ্গীত (গীতলতা) ফিরিয়ে আনতে হবে। ছন্দ, স্পন্দ, প্রয়োজনে অন্ত্যমিল, অনুপ্রাস সব কিছু দিয়ে কবিতাকে স্মরণযোগ্য করে তুলতে হবে।
২/ কবিতায় স্পর্শ , ঘ্রাণ সহ সকল সংবেদন স্পষ্ট করতে হবে।
৩/ সব মিলিয়ে পাঠককে আমূল নাড়িয়ে দিতে হবে শব্দের শক্তিতে। আমরা জেনেছি ‘শব্দই ব্রহ্ম্’। শব্দে শব্দে বিবাহ দিতে হবে যথাশব্দের ব্যবহারে। কোন শব্দের সাথে কোন শব্দ অনিবার্য, আমরা তা খুঁজে বের করব।
৪/ বাকসংযম অনিবার্য, যে কথা দুই লাইনে বলা যায়, সে কথা দশ লাইনে বলবোনা
৫/ রহস্য ও ব্যঞ্জনা - একাধিক পাঠে ও পাঠকবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের সম্ভাবনা থাকবে কবিতায়।
৬/ মৌলিক আবিষ্কার ও উন্মোচন থাকবে কবিতায়।
৭/ আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস, জীবন সংগ্রাম, যাপিত অভিজ্ঞতা সবই উঠে আসবে শিল্পিতভাবে।
৮/ কবিতা কোন মতবাদিক আদর্শের দাসত্ব করবেনা, যদিও জীবনলগ্ন দর্শন আবশ্যিকভাবেই উঠে আসতে পারে।
১০/ সব মিলিয়ে তৈরী হতে হবে এক অভূতপূর্ব রস - কবিতার রস।

কবিতার জয় হোক, কবিতার পরিবার সুখী হোক। "পারিবারিক" ব্লগ-জিন সকলের সদিচ্ছায় এক অনন্য সাধারণ মাধ্যম হয়ে উঠুক অসংখ্য কবিতার পাঠক পাঠিকা সৃষ্টি করুক - কবিতাকে ভালোবাসবার আত্মিক শুদ্ধতা প্রদান করুক ।

পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

কবিদের ২২গজ


- ১ -

অতিগোপন, আমি দেখছিলাম হাল্কাভাবে,সাধনসঙ্গিনী দেখছিলাম,

চিত্ত মহাসুখে আছে আর আমি কৃষ্ণের চিন্তায় মরে যা্ই,
আসলে কৃষ্ণ তো কবি যুবতী রসের কামনা আসঙ্গের অধিক।
প্রেরণা পরকীয়া দেবে নতুনের স্বাদ, দূতী দেবে সাঙ্খ্যদর্শন
এ যেন সহজ প্রক্রিয়া উপদেশগীতিকার গান, জীবনপ্রবেশে ইচ্ছুক।
‘হৃদয় লজ্জায় ঢাকে হৃদয়ের কথা’ আর আমি কামসূত্র ঢেলে দিই অঙ্গ-অপেরায়
আমি গ্রিক, হাল্কা কুয়াশায় প্রে

মিকার সাথে মিশে যাই গ্রিসের শরীরে
আমি বিকল্প পৃথিবীর আবেগমিশ্রিত উইকেটকিপার
আছি কবিদের হাটে আছি পালকের টুপি মাথায় জ্যান্ত খোলামেলা স্থানান্তরে
আহ্লাদিত, এসব দৃশ্য অপরূপ যৌনচুম্বন নোঙর ফেলেছে, রসে রসে
অপূর্ব কামিনী, আর আমি স্বতঃঘোষিত প্রেমিক, শিল্পসমন্বিত ট্রাজিক ...

(চলবে)


মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট, ২০১২

মুস্তফা কামরুল আখতার

এক চন্দ্রাভিসারী মানুষ ও হিমু-মিসির আলী

হিমু বা মিসির আলির রহস্যময় পথে হেঁটে
জগতের অদ্ভুত রহস্যময়তা ভেদ করে
মানবমনের অতি গভীরে ঢুকে যাবেন না আর,
একজন চন্দ্রালোকিত মানুষ ।
চিন্তাগুলোকে প্রকাশের যে ধরণ চিরকালীন,
তার বাইরে গিয়ে অসম্ভব সরল গলায়
আর কেউ স্পর্শ করবেন না আমাদের মন ।
বৃষ্টিদিনে ভেজা পথে খালি পায়ে হিমু
আর জট ছড়াবে না জটিল মানুষগুলোর ...
মিসির আলি আর দেখবেন না, -
অতি রূপবতী এক মানুষের কী অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক
জীবনের পেছনে এক অন্যরকম চন্দ্রালোক ।
চন্দ্রগীতি গাইতে গাইতে তার চরিত্রগুলো আর দেখবে না,
জোছনা রাতে 'সবাই গেছে বনে' ।
কেন চলে গেলেন ! কেন ! ...

অদেখা এক মানুষ কী ভাবে সত্বায় এভাবে প্রোথিত হলেন ? ...
চোখভরা আর্তি আর জল বলে,
এই জগতের রহস্যময়তার কতটুকুই আমরা বুঝি ?


অনেক লেখা স্মৃতিতে জমতে জমতে ...
একদিন এক মানুষ জীবনে এলেন ।
কতগুলো কালো হরফে মাথার ভেতরে গড়ে ওঠা
এক পথকে বদলে দিতে । দিলেনও ।
অনেক বদলালেন । অসামান্য এক পথ তৈরি করে,
ঝিমঝিম এক মায়াজাল আবার নতুন ভাবে
নতুন মস্তিষ্ক বানিয়ে দিলেন ।

শোনালেন এক অসাধারণ চন্দ্রগীতি,-
'ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়য়,
চাননি পশর রাইতে যেন আমার মরণ হয় ।'
জোছনায়, চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে
পথে চলার দৃশ্য এঁকে দিলেন,
অপার্থিব সুন্দর, যা নেই তা না ভাবতে ।
ভাবতে, যে ভাবে ঘটে । বোঝালেন, আশপাশ আর
চরিত্রগুলোকে চিত্রিত করতে, আর চিনতে ।

বিন্দু বিন্দু করে এক মোহময় বিভ্রম
আমায় গড়ে তুলেছিল এক চন্দ্রাভিসারী মানুষ ।
একদিন শক্ত হাতে তুলে নিয়েছিলাম বৈঠা ...
এক দুরাভিমুখী জলের ধারা বেয়ে
ছুঁয়ে দিতে তুমুল জোছনার গা ।
কখন, কে আমার মনে জোছনার
স্বপ্নীল তরলে কষ্ট ভাসিয়ে দিতে শিখিয়েছিলেন !
তার চাইতেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, - শিখেছিলাম ।

আজ মনে পড়ছে, সজল চোখেও
চন্দ্রকথায় হয়ে ওঠা যায় স্বপ্নচারী অসমসাহস ।
যিনি শেখালেন, তাকে বুকে রেখেই সরল চোখে
দেখে যেতে চাই পৃথিবীর গা বেয়ে পড়ছে
এক শুভ্র সুন্দর কল্যাণের ধারা ।
তিমিরে তীব্র জোছনার প্লাবন ।

( নন্দিত লেখক হুমায়ুন আহমেদের স্মরণে লেখা )



সিদ্ধার্থ শর্মা

নীলু - সীমান্ত
ভালবাসার মনিকোঠায়

একটি ব্যক্তিগত সংলাপ :

নীলু: সীমান্ত আমাকে বোলবে তুমি - কেন গত পক্ষকাল ধরে আমার আঙ্গিনায় বিষাদ পাখি বিরহের করুন কবিতা শোনায়?


সীমান্ত: তুমি কি জাননা মিলনের থেকেও বিরহ তোমাকে অনেক কাছে টানে আমায়? নিষ্প্রদীপ থেকে তোমার ভালবাসার স্নিগ্ধ আলোকে নিজেকে আলোকিত দেখি ...(নীলু তখন সীমান্তর দুই বাহুর বাঁধনে বক্ষলগ্না তিরতির করে কাঁপা দিশেহারা)

নীলু: তুমি তো অমনি-ই কিছু বলে দাও যাও এখন ছাড়ো .. আমার অবস্থা কি একটুও অনুভব করতে পারো?


সীমান্ত: সংজ্ঞাহীন অচেতন মন্দ্রিত আবেশে / স্বপ্নাচ্ছন্ন লাবন্যপুঞ্জে মদিরা নেশাতে মিশে / আকন্ঠ নিমজ্জিত প্রতিক্ষণে ভালোবেসে / অবাক অনুভবে সবাক মেঘাছন্ন প্রদেশে ...

নীলু: আমি জানিনা! জানিনা!! জানিনা!!! ... কবিতা ছাড়ো .... আমাকে নির্বাক করে দাও আদরের আবেশে...


সীমান্ত: এসো তবে করে দেই নির্বাক ওষ্ঠে ওষ্ঠ মিলিয়ে / মন পর্যন্ত পৌছে যাব শরীরী গলিঘুঁজি পেরিয়ে (অসম্ভব প্রত্যয়ী সীমান্ত নীলুর শরীরে মন খুঁজতে ব্যগ্র হয়ে পড়ে )

নীলু: আজ তোমার ভালবাসার আদরে ডুববো কবি / দেখব কেমনে আঁকো ভালবাসার ছবি / দিলেম তোমায় শরীরী ক্যানভাস দিলেম মনের রঙ / দেখি কেমনে সাজাতে পারো আমায় হয়ে আছি জবরজং / (নীলুর অসম্ভব সুন্দর দুটি গর্বিত চোখ তাকিয়ে থাকে সীমান্তর মুখে ... ওর লাজে রাঙা গাল / মনে করায় ভৈরবী উষাকাল )


সীমান্ত: দেখ চেয়ে আকাশে উড়ন্ত গাঙচিল / গভীর দৃষ্টিতে তোমার রহস্যের ঝীল / অবুঝ অভিমানী একটি মন / চুরি করে দেখে নেয় তোমার স্বপন / তিল তিল করে গড়ে তোলা তোমার যৌবন / আজ বিধিনিষেধ ভেঙ্গে ভালবাসার তপোবন / ইতি উতি ফুটে ওঠা মৌ মাখা সুগন্ধি রঙ বেরঙ্গি ফুল / সব্বনাসী নেশায় মাতিয়ে নেয় গুনগুনিয়ে অলিকুল / ফেরারী মন আজ দ্বার খুলে অপেক্ষায় গোনে প্রহর / তৃপ্ত হতে ...পূর্ণ হতে অতৃপ্ত অপূর্ণ কামনার কৃষ্ণ গহ্বর / (সীমান্ত অনেক অনেক সাহসী..)

নীলু: এক মুঠো জোছনা এনে দেবো / দেবো এক ঘড়া পবিত্র মেঘের জল / এক বুক ভালোবাসাতে ভরাবো / ভালবাসা পেয়ে ভালবাসা দিয়ে করবো জীবন সফল /

সীমান্ত: তোমায় পেলে - পাই না তল / স্তম্ভিত চাঁদের চোখে জল / জোছনা আমার ঘরে / বিছানা আলোকিত করে / উদ্বেলিত আলোকিত উজ্জ্বল / ভালবাসার পদ্ম কুঁড়ি দুটি / চুম্বন স্পর্শে রোমহর্ষে ফুটি / জানায় সনির্বন্ধ মিলন আকুতি / জাগাতে কিশলয়ী শরীর / সবুজ অবুঝ মন অধীর / উত্তাপের বাষ্পে সৃষ্টি করবো মেঘ / পুঞ্জিভূত আকাঙ্খিত মিলনের আবেগ ...


নীলু: প্লিজ সীমান্ত আমাকে এভাবে আদর দিয়ে পাগল কোরনা তুমি - শেষে পাগলিকে সকলে .....(নীলু অধীর)


সীমান্ত: পাগলামি যদি বিন্দাস পাগলামি হয় - বিশুদ্ধতায় পাগলি আমার সবচেয়ে প্রিয় ...../ তাকে নাইয়ে খাইয়ে চুল আঁচড়িয়ে - কপালে সব্বনাসী লাল টিপ এঁকে দিয়ে - ঠোঁটে গাড় লিপস্টিক দিয়ে লাল ঠোঁটের টিয়া করে আমার মনের সবুজ বনে ছেড়ে দেই - সে মনের সুখে উড়ে বেড়াক - ঘুরে বেড়াক পাগলামিতে এরকম অনুভব পাই তাতেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই ...

নীলু: অবুঝ মনে সবুজ টিয়া / সবুজ বনে অবুঝ হিয়া / এত কেন ভালোবাসো - এত কেন কাছে ডাকো? / কল্পনাতে কাছে আসো - আমাকে কি স্বপ্নে দেখ?


সীমান্ত: তুমি স্বপ্ন নও - তুমি স্বপ্নিল / তুমি ভালবাসা-র ঝিল / তোমাতেই ঝাপিয়ে পড়ে উড়ন্ত শঙ্খচিল / তুমি কল্পনা নও - তুমি কল্পিত / তুমি আহ্লাদিতা নারী চুম্বিত / অস্থিরতা কাটাতে আবেগে মথিত নিস্পেষিত / তোমাকেই আঘাত করে বারবার দুরন্ত শঙ্খচিল / চুম্বন পান শেষে ভালবাসার যন্ত্রনায় তুমি নীল


নীলু: আমি নীলু - আমি সীমান্তর নীল আকাশ ... আমি সীমান্তর নিশ্বাসের বাতাস সীমান্ত: তুমি আমার প্রতিবিম্ব - তুমি বিশ্বাস ... তুমি উচ্ছ্বাস ....তুমি এহসাস ...


সীমান্ত: চাঁদ না ছুঁয়ে বুঝিনি উত্তাপ / সূর্য্য চিরদিন-ই আমার কাছে নিরুত্তাপ / চাঁদের সারা শরীরে আমার ভালবাসার ছাপ ...

নীলু: তুমি একটি আস্ত বদমাস! সেই সন্ধ্যেটা আজও মনে আছে? , সেই চাপ আজও মনে আছে?.


সীমান্ত: উজ্জ্বল নীলাভ সন্ধ্যায় / সিক্ত বসনে আহ্লাদী ভালবাসায় / এলো চুলে ঢাকা দেহবল্লরী সীমা রেখায় / আজ-ও আমাকে উদ্বুদ্ধ করে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখায় ...

নীলু: তুমি কি জানো? রোম রোম শিহরণে কেঁপে কেঁপে ওঠে / আজও প্রথম দংশন স্পর্শ পাই আমার ঠোঁটে [:)]


সীমান্ত: তুমি থাকো ... তো ঝিমলী সোনাল জড়িয়ে আমার সাথে / বৃষ্টিতে ভিজে তোমার সাথে মন জড়িয়ে থাকে পাকে পাকে / টুপ টুপ ঝরে পড়া শিশির কিংবা মন কেমন করা জোছনা আলো / তোমারে আপন করে কাছে টেনে নিল - আরেকটু আদরে ভরে দিলো - ভালোবাসাতে ভরে নিল ...


নীলু: সীমান্ত আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে / আমার মনের কথা তোমার মনে কেমনে প্রকাশ পাচ্ছে / এক ছুটে তোমার কাছে পৌছে যেতে ইচ্ছে করছে ...

সীমান্ত: সোনাই দিঘী ... আমার কাছে এসো... আমার বুকে এসে মেশ ... নীলু: আর-ও কত কাছে চাও আমায়? / কেন বার বার এভাবে আমায় জড়াও? ...

সীমান্ত: ঠোঁট ছুঁয়ে দেই চোখে / পৌঁছে দেই প্রেমের অমৃতলোকে...

নীলু: আমার সব কান্না ধুয়ে নাও তোমার ঠোঁট দিয়ে / এভাবেই থাকো শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে / তোমার সরলতা দিয়ে জটিলতার আবর্ত থেকে সরিয়ে / সব অনুভব সব পুরুষ আমার মনে ঝরিয়ে / দাও আমায় কানায় কানায় পূর্ণ করে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরিয়ে / আমি নারী - এই অনুভব ভীষণ ভীষণ মনে করিয়ে ...

সীমান্ত: ভালবাসা আমাকে জটিলতা ছেড়ে সরল হতে শিখিয়েছে / পাহাড়ি নদীর মত স্বচ্ছ সুন্দর প্রবাহ দিয়েছে / ভালবাসার নীলু মনকে কাছে টেনে নিয়েছে / হারিয়ে যাওয়া জীবন আবার আবেগ ঘন অনুভবে ফিরিয়েছে ...

---

 
বিশেষ রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিশেষ রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

রবি শংকর স্মরণে - জাকির হোসেন

পন্ডিত রবি শংকর স্মরণে


উত্তর প্রদেশের বারানস কাঁদে !
বাংলাদেশের নড়াইলে তোমার পৈত্রিক নিবাস -
কালিয়া কাঁদে !
বিশ্বজুড়ে সুরের মূর্ছনায় বিষন্ন ব্যবধান ।
হটাত করেই তোমার শান্তিধামে গমন !
সমস্ত ভারত জুড়ে শোকের নীরবতা ।
বাংলাদেশ জুড়ে সংগীতপ্রেমীদের বেদনা ।
ভালবাসার তানপুরা-সেতার আর বাজবেনা !

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর হাত ধরে -
তোমার সাধনা, মনন, ইচ্ছে-বলয়,
দোসর-জনম তুমে পেলে শাস্ত্রীয় সংগীতে ।
মহাকবি ইকবালের কাব্য-সুরেও তোমার কীর্তি ।
স্মৃতিময় হলো 'পথের পাঁচালী', 'অপরাজিত' এবং
'অপুর সংসার' এর সঙ্গীতগুচ্ছ ।
চীরকাল তুমি অমর বাংলাদেশের হৃদয়ে !
লাল-সবুজ পতাকার ভালবাসায় ।
'ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ' -
তোমার মরণোত্তর উপহার ।
তোমার প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা ও
আজীবন সন্মাননা ।

তুমি নেই ! তবু আছ আমাদের হৃদয়ে !
বাংলাদেশের পরীক্ষিত অকৃত্রিম বন্ধু তুমি ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মানবাধিকার ও
'মানুষ মানুষের জন্য' - মানবতায় ছিলে তুমি ।
একদিকে-
বর্বর পাক-স্বৈরাচার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা,
বাংলার আকাশ-বাতাস কাঁদছে বারুদে !
লক্ষ লক্ষ শরণার্থী প্রতিবেশী ভারতে অমানবিক জীবনে,
ধর্ষিত হচ্ছে কত অজানা বীরঙ্গনা সে বাংলায় !
নদীর জলে লাশ ও রক্তস্রোত !
স্বাধীনতার জন্য বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ।
অন্যদিকে-
নিউইয়র্ক এর ম্যাডিসন-স্কয়ার-গার্ডেনে,
'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' ।
মানবতা ও অধিকার আদায়ের উত্সাহে -
তোমার সেতারে বাজলো 'বাংলার ধুন' ।
জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ' গানে,
বব-ডিলানের গিটারেও মানবতার সুর ।
বাংলার মুক্তিযুদ্ধ ও অসহায় শরণার্থীদের জন্য -
তোমার ও ভিনদেশী বন্ধুদের,
'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' ও আন্তর্জাতিক অনুদান ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরের জাদু তুমি ।
পশ্চিমা দেশে দেশে তোমার সেতারে মুগ্ধ কত শ্রোতা ।
যেন সমার্থক - তুমি ও ভারতীয় সঙ্গীত !
ভারত সরকার ও জনগনের অনন্য সন্মাননায় তুমি ।
'রাষ্ট্রপতি পদক', 'পদ্মভূষণ' ও 'ভারতরত্ন' ভূষণে তুমি ।
ভারতীয় রাজ্যসভার সন্মানিত সদস্যও ছিলে তুমি ।
তিন-তিনবার 'গ্রামি-অ্যাওয়ার্ড' জয়ে তুমি ।
ভিনদেশী কত 'সন্মানসূচক' উপাধিতেও তুমি !

তোমার পরস্পরা -
স্মৃতিময় অন্নুপুর্না দেবী, শু-জোন্স ও সুকন্যা কৈতান ।
তোমার উত্তরসুরী -
শুভেন্দ্র, আনুশকা শংকর ও নোরা-জোন্স ।
আপন সংস্কৃতি ও ঐতিয্য ধারণে ওরা প্রতিষ্ঠিত ।
তবুও ! এ যেন হটাত -
তোমাকে না পাওয়ার বেদনায় ওরা !
ওদের নীরব অশ্রুজল ও পিতৃহারা আর্তনাদ !

বিশ্ব-সংগীত জগতের কিংবদন্তী তুমি ।
কাঁদালে সেতারের মূর্ছনায় ! কাঁদালে বিশ্বকে !
প্রশান্ত, আটলান্টিক, আরব-পারস্য ও
ভারত মহাসাগরের শোকগাঁথায় তুমি ।
চিরন্তন, চীরসবুজ, শাস্ত্রীয় ও ধ্রুপদী পান্ডিত্যে তুমি ।
বঙ্গোপসাগর হতে জলকণা যাত্রায় -
মেঘের বন্ধুবেশে, হিমালয়ে শুভ্রতায় তুমি ।
তুমি রয়ে গেছো আজন্মলালিত সংগীতের প্রেমে !
মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসায় ।

হটাত তোমার শান্তিধামে যাত্রা !
তবুও সংগীতের মূর্ছনায়, সেতার-বীন-বাদ্যে,
বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে -
ইথারে সামাজিক যোগাযোগে, বন্ধু-সভায়
মানবতার প্রার্থনায়,
পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি সবার !
" চীর শান্তিময় হোক তোমার আত্মা,
তোমার পরিবারের প্রতি সমবেদনা "

চীরকাল তুমি রবে বিশ্ব-সংগীতের হৃদয়ে !
আগামী প্রজন্মের চেতনায়, উত্সাহে -
শান্তির শপথে, মানবতার জয়োগানে !
গর্বিত ভারত ও বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা নিবেদনে -
ধরনীর আকাশে সন্ধ্যাতারা রূপে !
কবিতায়, গানে - নতুন বাণী-চিরন্তনে

" সেতার যদি হয় অবিনশ্বর -
শুধু তুমিই সেথায়, পন্ডিত রবিশংকর "

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

সরদার ফারুক

বিশেষ রচনা

কবিতা লেখা


কখনো কখনো কবিতা লেখাকে আমার মাছ ধরার সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে হয় । আপনি ছিপ নিয়ে বসে আছেন পুকুরের পাশে । হয়তো অনেকক্ষণ পর একটু ফাৎনা নড়ে উঠলো , আপনি ছিপটা টান দিলেন - কিছুই উঠলোনা । চতুর মাছ টোপ খেয়ে পালিয়ে গেছে । অথবা কখনো দেখলেন আস্ত বড়শিটাই গায়েব - কাছিম কিংবা কাঁকড়ার কাজ । আপনি জানেন না , মাছ পাবেন কিনা , তবু ছিপ নিয়ে বসে থাকতেই হবে। মাঝে মাঝে আপনার মনে হতে পারে আপনি যেন কখনোই লেখেননি , অথবা আর কখনোই লিখতে পারবেন না । সে বড় কষ্টের কাল । আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে পৌঁছায় । তবে যারা চেষ্টা-কবি বা সেয়ানা কবি - তাদের কোন অসুবিধা নেই ।তারা যে কোন বিষয় ঠিক করে , আগে থেকে অভিধান থেকে কিছু শব্দ বের করে, নিয়মে সাজিয়ে কারখানার মতো উৎপাদন চালিয়ে যান । কবিকে থাকতে হয় অপেক্ষায় -কখন আসবে সেই বুনো হাওয়ার গোপন প্ররোচনা ,বেপরোয়া চিত্তবিকার! আমার মনে হয় খুব যুক্তিবাদী এবং সুস্হির লোকেদের জন্য কবিতা না। কবিতা কিছু যুক্তিহীন আবেগ ও বিশৃঙ্খলাকে ধারণ করতে চায় । সেয়ানারা জাগতিক সাফল্যও চায় ,আবার কবিখ্যাতিও চায় । চারপাশে তাই দেখবেন আমলা কবি , ব্যবসায়ী কবির ভিড়। স্তুতি , খ্যাতি ,পদক এদের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খায়। প্রকৃত কবির এসবের দরকার নেই। তার চাই আনন্দ -দিগ্বিজয়ী সম্রাটের আনন্দ ।

কারো কারো কাছে কবিতা লেখার পুরো বিষয়টাই একটা দুরারোগ্য ব্যাধি বলে মনে হয় - লোকনিন্দা , উপহাস যার একমাত্র পুরষ্কার ! হতে পারে , তবু অনেকেই এই অসুখ পুষে যাবে আমরন - ‘অসম্ভবের পায়ে’ মাথা কুটে মরবে। ধরা দাও, ধরা দাও ‘অধরা মাধুরী’ ছন্দোবন্ধনে!

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

সরদার ফারুক

ছন্দ নিয়ে কিছু সহজ কথা


শুরুতেই বলে রাখি এটা কোনও মৌলিক লেখা না , এবং অগ্রসর ছন্দচর্চাকারীদের জন্যও লেখা হয়নি ।

ছন্দের প্রয়োজনীয়তা

যদিও গদ্যছন্দ বলে একটা ছন্দ আছে , এবং সমর সেনসহ অনেক বিখ্যাত কবিই গদ্যছন্দে লিখেছেন , তবু আমি মনে করি ছন্দের প্রয়োজন কখনো ফুরোয়নি আর ফুরোবেও না ।কবিতায় আমরা যে দোলা বা স্পন্দের কথা বলি তা এই ছন্দ থেকেই আসে ।অনেকে ছন্দকে বন্ধন মনে করে বন্ধনমুক্তিতে বিশ্বাসী । তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি-রবীন্দ্রনাথ সেতারের উদাহরন দিয়েছিলেন । সেতারের তারের বন্ধনেই সুরের মুক্তি ।বন্ধনে মুক্তি অদ্ভুত শোনালেও চূড়ান্ত মুক্তি মানে বিশৃঙ্খলা । ছন্দে লিখুন বা না-ই লিখুন , জেনে রাখাটা দরকার । এটা কোনও আকাদেমিক আলোচনা না , কেবল একটা সহজ গাইড লাইন ।

৩ ধরনের ছন্দ

আপনারা নিশ্চয় জানেন বাংলা কবিতার ছন্দকে মোটামুটি তিন ধরনের বলে ধরে নেয়া হয় , অক্ষরবৃত্ত ,মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্ত ।মাত্রাবিচারের রীতিভেদে ছন্দও পাল্টে যায় ।

মাত্রা কাকে বলে ?

সোজা কথাই মাত্রা মানে পরিমাপক অর্থাৎ ইউনিট অফ মেজার ।জল মাপি লিটারে , কাপড় মাপি মিটারে আর ছন্দ মাপি মাত্রায় ।কবিতার এক - একটি পংক্তির মধ্যে যে ধ্বনিপ্রবাহ থাকে , এবং তাকে উচ্চারন করার জন্য মোট যে সময় আমরা নিয়ে থাকি , সেই উচ্চারনকালের ক্ষুদ্রতম এক-একটা অংশই হল মাত্রা । প্রবোধচন্দ্র সেন তারই নাম দিয়েছেন কলা । কলা মানে এখানে অংশ । ষোল কলায় যেভাবে চাঁদ পূর্ণ হয় , তেমনি কলা বা মাত্রার সমষ্টি দিয়ে তৈরি হয় পূর্ণ এক-একটি পংক্তি(লাইন) উচ্চারনকাল ।

কঠিন লাগছে ? আরো সোজা ভাবেই মাত্রাবিচারের পদ্ধতি নিচে আলোচনা করবো ।

অক্ষরবৃত্ত

বাংলা কবিতার খুবই বনেদি ছন্দ ।রবীন্দ্রনাথের আগে , রবীন্দ্র কাব্যের সূচনাপর্বেও বাংলা কবিতা প্রধানত অক্ষরবৃত্তেই লেখা হয়েছে , এবং বিস্ময়করভাবে এখন পর্যন্ত অক্ষরবৃত্ত তার শীর্ষ আসন ধরে রেখেছে ।

জীবনানন্দের গ্রণ্হভূক্ত কবিতার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশো ।এই মোট ৩৫২টি কবিতার ২৭৫টি অক্ষরবৃত্তে ,মাত্রাবৃত্তে ১৬টি , স্বরবৃত্তে ৩৭টি এবং গদ্যছন্দে ২৪টি ।ভেবে দেখুন !

আমার জানা মতে বিনয় মজুমদার তাঁর সমস্ত কবিতা অক্ষরবৃত্তে লিখেছেন (উনি অবশ্য পয়ার বলতেন ) । আমারতো মনে হয় , একজন কবি শুধু অক্ষরবৃত্তে লিখেই কবিজীবন পার করে দিতে পারেন ।

অক্ষরবৃত্তের মাত্রাগণনা

অক্ষরবৃত্তের লক্ষণ কী ?লক্ষণ মোটামুটি এই যে , এ ছন্দে যত অক্ষর বা বর্ণ , তত মাত্রা অর্থাৎ কিনা প্রতিটি অক্ষরই এখানে ১টি মাত্রার মর্যাদা পেয়ে থাকে , যেমন -

১/শ্যামল সুন্দর প্রভু কমললোচন (১৪ মাত্রা -গুণে দেখুন )
২/পোড়া প্রণয়ের বুঝি জরামৃত্যু নাই (১৪ মাত্রা )

বিনয় মজুমদারের সহজ ফর্মুলা-

“বাংলা অক্ষরের উপরে যে মাত্রা দেয়া আছে আমি তাকেই মাত্রা বলি ।যথা , ‘অ’ অক্ষরের উপরমাত্রা দেয়া আছে ,সুতরাং অ অক্ষরে একটি মাত্রা । ‘ত’ অক্ষরে মাত্রা দেয়া আছে সুতরাং ত অক্ষরে একটি মাত্রা । ‘স্ক’ ‘ল্ল’ ইত্যাদিতেও একটি মাত্রা ।অর্থাৎ অক্ষরবৃত্তে যুক্তাক্ষরেও একটিই মাত্রা ।‘ৎ’ তে মাত্রা নেই , তাই ‘উৎফুল্ল’ অক্ষরবৃত্তে ৩ মাত্রা , ‘হঠাৎ’ ২ মাত্রা ।তিনটি অক্ষরও যদি যুক্ত থাকে যেমন ‘উজ্জ্বলে’ –‘জ্জ্ব’ কে এক মাত্রা গণনা করে মোট ৩ মাত্রা হবে ।”

“ এটাই নির্ভুল ও প্রাথমিক নিয়ম । অবশ্য এর পরেও অল্প কিছু ছোটো নিয়ম আছে ।

স্বরবর্ণে ‘এ’ অক্ষরে , ‘ও’ অক্ষরে মাত্রা নেই । কিন্তু ‘এ’ অক্ষরে সর্বদাই এক মাত্রা ধরতে হবে , যেমন ‘এসো’ ২ মাত্রা ।‘এখন’ ৩ মাত্রা ।

‘ও’ অক্ষরে মাত্রা নেই । তবে অধিকাংশ শব্দেই ‘ও’ অক্ষরে একমাত্রা ধরতে হবে ।অল্প কয়েকটি শব্দে ‘ও’ অক্ষরে শূন্য মাত্রা । ‘ওঠ’ ২ মাত্রা , কিন্তু ‘হাওয়া’, ‘যাওয়া’ , ‘খাওয়া’ , ‘চাওয়া (অর্থাৎ- শব্দের শেষে ‘ওয়া’ থাকলে ) ‘ও’ শূন্য মাত্রা । এগুলোকে ২ মাত্রা বলেই গণ্য করতে হবে ।”

*( কেন করতে হবে সে বিশদ ব্যাখ্যাই না গিয়ে কেবল এই শব্দগুলো মনে রাখতে বলছি )

“এবার ব্যঞ্জনবর্ণ।ব্যঞ্জনবর্ণে প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘ঙ’ এবং ‘ৎ’ - এই দুটি অক্ষরের উপরে মাত্রা আঁকা হয়না ।বাঙ্ময় , কঙ্কাল, অঙ্ক এবং অনুরূপ সব শব্দে ‘ঙ’ অক্ষরের সঙ্গে অন্য অক্ষর যুক্ত হয়ে যুক্তাক্ষর তৈরি হবার ফলে এই যুক্তাক্ষরে এক মাত্রা ।অর্থাৎ ‘কঙ্কাল ‘ ৩ মাত্রা , ‘অঙ্ক’ ২ মাত্রা ।

তবে শব্দের শেষে ‘ঙ’ থাকলে ‘ঙ’ অক্ষরে সর্বদাই একমাত্রা ধরতে হবে । যেমন -‘রঙ’ ২ মাত্রা ।

‘ৎ’ শব্দের মাঝে থাকলে শূন্যমাত্রা । যেমন ‘উৎপ্রেক্ষা ’ ৩ মাত্রা । আবার শব্দের শেষে থাকলে ‘ৎ’ ১ মাত্রা দাবি করে , যেমন ‘প্রদোৎ’ ৩ মাত্রা , ‘হঠাৎ’ ৩ মাত্রা ।”

‘মাত্রা গণনার নিয়মাবলী এখানে সমাপ্ত । বাংলা অভিধানের এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার- এর অধিক শব্দগুলির মাত্রাগণনা এই অল্প কটি নিয়ম দিয়েই আমি সারা জীবন করেছি ।”

আমরা অক্ষরবৃত্তে মাত্রা গণনার নিয়ম আলোচনা করেছি ।এবারে একটি পংক্তিতে (লাইনে ) কয় মাত্রা বসানো যায় সেকথা বলছি ।অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চাল আসলে ৪ মাত্রার চাল । প্রতিটি পর্বে (অংশে ) থাকে ৪টি মাত্রা , শেষে থাকে ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।সোজা কথায় অক্ষরবৃত্তে মাত্রাসংখ্যার ফর্মুলা হচ্ছে ৪ এর গুণিতক +২ ।

যেমন :
৪ x ১ +২ = ৬
৪ x ২ + ২ = ১০
৪ x ৩ + ২ = ১৪

এই নিয়মে ১৮, ২২ , ২৬ , ৩০ এভাবে মাত্রাসংখ্যা হতে পারে ।অবশ্য অত বড়ো লাইন কেবল জীবনানন্দ দাশই লিখে গেছেন ।

*৬ মাত্রার পংক্তি ভেঙে দেখাই --

খেলাঘর/ভাঙে
ঝড়ের আ/ঘাতে ।

*১০ মাত্রা ভেঙে দেখাই --

মুখ নেই,/লোভ ফুটে/ আছে ;
শিকারীর /সহজ উ/দ্যম
নিরঙ্কুশ /সফলতা / আছে ।

( উদাহরনগুলো এই অকবির রচনা বলে ভাল নাও লাগতে পারে )

*১৪ মাত্রা ভেঙে দেখাচ্ছি --

সহসাই / ফুঁসে ওঠে /কুলীন গো/ক্ষুর
অন্ধ রোষে /বিষ ঢালে/ নরম মা/টিতে ।

• ১৮ মাত্রার উদাহরন---

বজ্রের উ/ল্লাসে খোলে/বৃক্ষদের/তৃষ্ণার দ/রোজা ।

*২২ মাত্রার উদাহরন বিনয় মজুমদারের কবিতা থেকে --

সুদূর স/মূদ্রজলে/ একটি গী/টার ভেসে/চলেছে এ/খন
যখন স/কলে ডুবে/ নিশ্চিহ্ন হ/য়েছে /সব হারিয়ে গি/য়েছে ।

আর উদাহরন বাড়াবো না ।আপনারা ২৬ মাত্রা এমনকি ৩০ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে নিজেরাই খুঁজে বের করুন ।

আরো কিছু জরুরী কৌশল

এভাবে ৪ মাত্রা করে লিখতে গেলে পাগল হয়ে যাবেন । তাই সহজ কায়দা হলো-দুটো মহাপর্বে লাইনটাকে ভাগ করে নেয়া ।প্রথম মহাপর্বে থাকবে ৮মাত্রা , বাকি মাত্রাগুলো পরের মহাপর্বে ।অর্থাৎ ভাঙতে হবে নিচের নিয়মে ।

(*৬ মাত্রা এভাবে ভাঙার কিছু নেই )

১০ মাত্রা=৮+২
১৪ মাত্রা= ৮+৬
১৮ মাত্রা+৮+১০
২২ মাত্রা=৮+১৪

এইভাবে বাকিগুলো আপনারা ভেঙে নিন ।
এই নিয়মে ভাঙলে লাইনের নতুন চেহারা হবে--

সম্রাজ্ঞীর মতো চোখে/তার খেলা করে
অযুত গোলাপ , আর/ পাতক কীটেরা
কুরে কুরে খায় সেই /চোখের ঐশ্বর্য
তীব্র হিমে ক্ষয়ে যায়/ফুলের প্রতিভা ।
(অধমের অক্ষম কবিতাকে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। )

এরপরে সবচে’ জরুরী কথা হচ্ছে , প্রথম ৮ মাত্রার মহাপর্বকে না ভাঙার চেষ্টা করবেন । যেমন এভাবে ভাঙবেন না --
তোমাদের এখানে পা/হাড়ী ঝর্ণা আছে ?

*এভাবে ভাঙলে একবারে অশুদ্ধ হবেনা , তবে পাঠকের পড়তে কষ্ট হবে । তাই যতটা সম্ভব ৮ মাত্রার প্রথম মহাপর্বকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেষ্টা করবেন ।

অক্ষরবৃত্তের আরো কিছু নিয়ম
শব্দের পরে শব্দ গাঁথারও একটা নিয়ম আছে ।ছন্দের জাদুকর নামে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একটা সোজা কথা বলে দিয়েছেন -- বিজোড়ে বিজোড় গাঁথো , জোড়ে গাঁথো জোড় । অর্থাৎ বিজোড় শব্দের সাথে বিজোড় শব্দ এবং জোড় শব্দের সাথে জোড় শব্দ ব্যবহার করবেন ।কেন করবেন ? কারন তাহলে পাঠকের কান আহত হয়না ।

কখনো নিচের নিয়মে সাজাবেন না--
৩+২+৩ , ৫+২+১ ,২+৩+৩ ,কেউ কেউ অবশ্য ৫+৩ ও নিষেধ করেন ।অবশ্য ৩+৫ ঠিক আছে ।
আপাতত অক্ষরবৃত্তের নিয়মের আলোচনা এখানেই শেষ করছি । এটুকু আস্তে আস্তে অনুশীলন করুন ।অল্প কিছু কথা বাকি কিস্তিতে দিয়ে দেবো ।অবশ্য এই আলোচনাটুকুও আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় ।

জরুরী একটা ভুলে বসে আছি । এখন অক্ষরবৃত্ত বেশির ভাগই অমিল মুক্তকে লেখা হয় ।অমিল তো বুঝতেই পারছেন অন্ত্যমিল নেই (অবশ্য অন্ত্যমিলেও দারুণ কবিতা লেখা যায় ) , আর মুক্তক মানে বিভিন্ন লাইনের বিভিন্ন দৈর্ঘ্য হতে পারে একই কবিতায় ।যেমন এক লাইনে ১৪ আবার পরের লাইনে ১০ ,তারপর আবার ৬ কিংবা ১৮ , কবির প্রয়োজনে ।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ

ভূমিকা:
বন্ধুরা , আমরা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে আলোচনা মোটামুটি শেষ করেছি । এবারে আমরা মাত্রাবৃত্ত নিয়ে কথা বলবো ।প্রথমেই বলে নেই , এই পদ্ধতি অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির থেকে ভিন্নতর । কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছন্দ শেখার যে সহজ ফর্মুলা দিয়েছেন - তা থেকেই মূলত আমি আমার মতো করে সংক্ষেপে মাত্রাবৃত্তের নিয়মগুলো তুলে দিচ্ছি । তবে এ ও বলে রাখি - স্বরবৃত্ত ছন্দের ক্ষেত্রে কিন্তু এইসব সহজ ফর্মুলায় চলবেনা , সেক্ষেত্রে সিলেবল বা দল ( মুক্তদল ও রুদ্ধদল)দিয়েই মাত্রার হিসাব করতে হবে । ওখানে আর অক্ষর দিয়ে হিসাবের সহজ কায়দা চলবেনা ।সিলেবল হচ্ছে উচ্চারণের এক-একটি ইউনিট বা একক ।অর্থাৎ স্বরবৃত্তে আর চোখের হিসাব চলবেনা , কানের বিচারে চলতে হবে বেশি করে ।

আমি সহজ ফর্মুলার লোক , তাই মাত্রাবৃত্ত পর্যন্ত গিয়েই থেমে যাব । স্বরবৃত্ত নিয়ে যেহেতু নতুন কায়দা খুঁজে পাইনি , সেহেতু ওটা নিয়ে আপাতত আলচনা করছি না। আমার উদ্দেশ্য নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ? বাংলা কবিতার প্রধান ৩ ছন্দের মধ্যে যদি ২টি ছন্দের সোজা পদ্ধতি যদি আমরা জেনে নিতে পারি , আর কী চাই ?

বাংলা কবিতার সিংহভাগ এখনো এই দুটো ছন্দেই লেখা হয় । ছড়ার ছন্দটি স্বরবৃত্তেরওটা আপাতত আলচনা করছি না - তবে স্বরবৃত্তে জীবনানন্দ দাশসহ অনেক কবিই সার্থক কবিতা লিখেছেন । যাহোক , আমি নিজে অবশ্য একটাও লিখিনি ।

মাত্রাবৃত্তে মাত্রা গণনা :
অক্ষরবৃত্তে আমরা মোটের ওপর(কিছু ব্যতিক্রম আগেই উল্লেখ করেছি)যত অক্ষর তত মাত্রা এই ফর্মুলায় চলেছি । যুক্তাক্ষরকেও এখানে আমরা ১ মাত্রা দিয়েছি ।তবে মাত্রাবৃত্তে যুক্তাক্ষরকে কিন্তু পূর্ণ মূল্য দিতে হবে , অর্থাৎ ২ মাত্রা দিতে হবে ।অনেকেই তাই মাত্রাবৃত্তকে ‘যুক্তাক্ষর ভাঙা ছন্দ ’ বলে অভিহিত করেন ।একটা উদাহরন দেই--‘কষ্ট ’ শব্দটি অক্ষরবৃত্তে ২ মাত্রা , কিন্তু মাত্রাবৃত্তে ভেঙে গিয়ে হবে ‘ ক ষ্ ট ’ - ৩ মাত্রা ।বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয় ? আরেকটা বলি - ‘ছন্দ’ অক্ষরবৃত্তে ২ মাত্রা , আর মাত্রাবৃত্তে ৩ মাত্রা (ছ ন্ দ ) ।

তবে এখানেও একটা ব্যতিক্রম মনে রাখতে হবে । তা হচ্ছে শব্দের প্রথমে কোন যুক্তাক্ষর থাকলে সেটা ভাঙা সম্ভব নয় , সে কারনে মাত্রাবৃত্তেও সে ১ মাত্রাই পাবে । বোঝেন নি ? ধরুন ‘ক্লাস’ শব্দটি । এটি কিন্তু অক্ষরবৃত্ত , মাত্রাবৃত্ত দুই ছন্দেই ২ মাত্রা পাবে । কারন শব্দের শুরুতেই যুক্তাক্ষর ‘ক্ল’ কে ভাঙা যাচ্ছেনা ।

তাহলে সোজা কথায় আমরা জানলাম - শব্দের মাঝখানে অথবা শেষের যুক্তাক্ষরকে আমরা মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রার মর্যাদা দেব , আবারও বলি শব্দের প্রথমে যুক্তাক্ষর থাকলে ১ মাত্রা-ই দেব ।

রবীন্দ্রনাথই এই ছন্দের স্রষ্টা । ‘মানসী’ পর্বের কবিতা থেকেই এই ছন্দের সূচনা । ‘মানসী’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন , “ আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নূতন শক্তি দিতে পেরেছি।” বোঝাই যায় , এখানে পূর্ণ মূল্য বলতে ২ মাত্রার মূল্য ।

যুক্তাক্ষরের বাড়তি বোঝা নিয়ে অক্ষরবৃত্ত যদি হাতির চালে চলে , মাত্রাবৃত্ত চলে তেজী ঘোড়ার মতো ।
অক্ষরবৃত্ত জোড়া দিতে চায় , মাত্রাবৃত্ত চায় ভাঙতে ।

মাত্রাবৃত্তের নানারকম চাল
আমরা অক্ষরবৃত্তকে দেখেছি ৪ এর চালে চলতে ।এর লাইন তৈরি করেছি ৪ এর গুণিতক + ২ দিয়ে ।এখানে মাত্রাসংখ্যা সব সময় আমরা ৪ যোগ করে বাড়িয়েছি , যেমন ,৬ ,১০ ,১৪, ১৮,২২ - মনে আছে নিশ্চয় ?কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন ওখানে আবার +২ কেন বাপু ?এরও কারন আছে , ছন্দোগুরুরা এম্নি এম্নি এই বাড়তি ২মাত্রা সবখানে রাখেননি ।কবিতা পড়তে পড়তে একটু দম ফেলার অবকাশ চাই, একটানা ছুটতে গেলে নাভিশ্বাস উঠে যেত ।ঐ ২ মাত্রাতেই সেই দম ফেলার জায়গা ।

বাড়তি ২ মাত্রা না থাকলে এ রকম হতো :
বাজে লক্ষ ঢাকঢোল
চতুর্দিকে হট্টগোল ।
আর সহ্য হয় কত ,
প্রাণ হল ওষ্ঠাগত ।
ভক্তেরা বিষম খান ,
দলে দলে মূর্ছা যান ।

--দাঁড়ি-কমা থাকা সত্ত্বেও লাইনের শেষে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা । ছন্দের তাড়না প্রবল হয়ে পাঠককে পাগলের মতো ছুটিয়ে মারছে ।

অক্ষরবৃত্তের চাল কেবল ৪ মাত্রার চাল , তবে মাত্রাবৃত্তের চাল কিন্তু এক ধরনের নয় । হ্যাঁ , মাত্রাবৃত্ত নানান চালে চলে ।
এখানে অক্ষরবৃত্তের মতো ৪ মাত্রার চালের পাশাপাশি ৫ মাত্রার চাল , ৬ মাত্রার চাল , আর ৭ মাত্রার চাল আছে ।
লাইনের এক-একটা অংশে বা পর্বে মাত্রাসংখ্যা দিয়েই আমরা বিচার করবো , কোনটা কত মাত্রার চাল ।কঠিন লাগছে ? আরে ভাই , উদাহরন দিতে শুরু করলে দেখবেন পানির মতো !

মাত্রাবৃত্তে ৪ মাত্রার চাল একটা বানিয়ে ফেলি ---

নির্জন রাত্রিতে কাকে তুমি ডাকো ?
কান্নার জল দিয়ে কার ছবি আঁকো !

ভেঙে দেখাই---
নির্জন/রাত্রিতে/কাকে তুমি/ডাকো ?
কান্নার/জল দিয়ে/ কার ছবি/আঁকো?

(ইসরে , কাঁচা পদ্য একেবারে ! যাক বাপু ছন্দ বোঝা গেলেই চলে । এখানে নির্জন =নি র্ জ ন , রাত্রিতে=রা ত্ রি তে ,কান্নার=কা ন্ না র )

*এখানে কী দেখছি ? ৩ টে করে ৪ মাত্রার পর্ব(অংশ) প্রত্যেক লাইনে , শেষে একটা ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।ভাঙা বলছি এ জন্য যে , এটি ৪ মাত্রার তো আর নয় ।

যাহোক , মাত্রাবৃত্তে এই ভাঙা পর্ব আপনি রাখতেও পারেন , নাও পারেন । ভাঙা পর্বের মাত্রাসংখ্যা ১, ,২ বা ৩ - আপনার ইচ্ছেমতো রাখতে পারেন ।

আরেকটা উদাহরন তৈরি করা যাক --
অস্ফুটে বলেছে সে কী ,
আমি তার কিছু শুনিনি ।

*ভেঙে দেখি চেহারাটা--
অস্ফুটে/বলেছে সে/ কী ,
আমি তার /কিছু শুনি/নি

** অস্ফুটে ( অ স্ ফু টে - ৪ মাত্রা )।এখানে দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক লাইনে ২টা করে ৪ মাত্রার পর্ব ,আর একটি করে ১ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।

তাহলে বোঝা গেল প্রতি লাইনে পর্বের সংখ্যা আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে ।ভাঙা পর্বেও বৈচিত্র্য আনতে পারেন । ইচ্ছে করলে প্রতিটি লাইন শেষে একই মাত্রার আবার ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ভাঙা পর্ব রাখতে পারেন ( ১,২,৩ ) ,আবার না ও রাখতে পারেন ।

আর একটা কথা - অন্ত্যমিল রাখা না রাখাও কিন্তু আপনার ব্যাপার ।

মাত্রাবৃত্তে ৫ মাত্রার ছন্দ

এবারে ৫ মাত্রার কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া যাক -

তোমার চোখে কিসের ছায়া গভীর কালো ?
ছিন্ন পাতা ঝরে পড়ছে হাওয়ার হাতে ;
কোথাও যেন মেঘ জমেছে বিষণ্নতার
কেউ জানেনা কারনটা কী মন খারাপের ।

পর্ব হিসাবে ভাঙলে এ রকম দাঁড়াবে :

তোমার চোখে/ কিসের ছায়া/ গভীর কালো ?
ছিন্ন পাতা/ ঝরে পড়ছে/ হাওয়ার হা/তে ;
কোথাও যেন/ মেঘ জমেছে/ বিষণ্নতা/র
কেউ জানেনা/ কারনটা কী/ মন খারাপে/র ।

* প্রতি লাইনে ৫ মাত্রার ৩টি করে পর্ব । প্রথম লাইনে ভাঙা পর্ব নেই ।অন্যগুলোতে ১ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।(ছিন্ন = ছি ন্ ন /৩ মাত্রা , বিষণ্নতা= বি ষ ণ্ ন তা/৫ মাত্রা )।

এই দুর্বল কবিতায় মন না ভরলে ভাল একটা কবিতা দেই :
আসতে-যেতে এখনো তুলি চোখ
রেলিঙে আর দেখিনা নীল শাড়ি ।
কোথায় যেন জমেছে কিছু শোক ,
ভেঙেছ খেলা সহসা দিয়ে আড়ি ।
এখন সব স্তব্ধ নিরালোক ;
অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে বাড়ি ।
---নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।

ভেঙে দেখালে---
আসতে-যেতে/ এখনো তুলি/ চোখ
রেলিঙে আর/ দেখিনা নীল/ শাড়ি ।
কোথায় যেন/ জমেছে কিছু/ শোক ,
ভেঙেছ খেলা/ সহসা দিয়ে/ আড়ি ।
এখন সব/ স্তব্ধ নিরা/লোক ;
অন্ধকারে /ঘুমিয়ে আছে/ বাড়ি ।

*দুটো করে ৫ মাত্রার পর্ব সাথে ২ মাত্রার ভাঙা পর্ব ।

আগেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে আমরা ঘোড়ার চালের সাথে তুলনা করেছি ।আপনারা সবাই নিশ্চয় অশ্বখুরধ্বনি শুনেছেন ? ৪ মাত্রার চাল এর ধ্বনি যদি হয় খট্ খট্,খট্ ,খট্ ; ৫ মাত্রার ধ্বনি তবে খটাশ খট্ , খটাশ খট্ ।অন্য কথায় বলা যায় - বেজোড় জোড় , বেজোড় জোড় । মাঝে মাঝে অবশ্য জোড়-বেজোড় হয়ে গেলে তেমন কিছু দোষের নয় ।

মাত্রাবৃত্তে ৬ মাত্রার ছন্দ
উদাহরন দেয়া যাক :
খেলার মধ্যে ভুল হলে আর নতুন খেলার
সুযোগ তো নেই ।তলিয়ে যাচ্ছো ভুল আবর্তে ,
আসবেনা কেউ অন্ধকারের অতল গুহায় ।

*খুব একটা সুবিধার হলনা । তবু এখানে দুটো বিষয় দেখাচ্ছি -১/ ভাঙা পর্ব রাখিনি ,২/অন্ত্যমিল রাখিনি ।ভেঙে দেখাবো না কি আপনারাই ভেঙে দেখবেন ?

আরেকটা উদাহরন দেই । এবারে নীরেন্দ্রনাথ থেকে :
যন্ত্রণা থেকে আনন্দ জেগে ওঠে
শোক সান্ত্বনা হয় ;
কাঁটার ঊর্ধ্বে গোলাপের মতো ফোটে
সমস্ত পরাজয় ।

ভাঙলে ---
যন্ত্রণা থেকে/ আনন্দ জেগে/ ওঠে
শোক সান্ত্বনা/ হয় ;
কাঁটার ঊর্ধ্বে/ গোলাপের মতো/ ফোটে
সমস্ত পরা/জয় ।

* এখানে দেখলাম সব লাইনে পর্বসংখ্যা সমান নয় । প্রথম আর ৩য় লাইনে ২টি করে পর্ব , কিন্তু ২য় আর ৪র্থ লাইনে ১টি করে পর্ব । আবার অন্ত্যমিলেও বৈচিত্র্য -১ম-৩য় ,২য়- ৪র্থ । ভাঙা পর্ব অবশ্য সবখানেই ২ মাত্রার ।পর্বসংখ্যায় এই বৈবিচিত্র্যের নিরীক্ষাটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের আগেই শুরু করেন কবি বিষ্ণু দে ।

৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত
এটা শেষ করতে পারলে এই যাত্রা বেঁচে যাই ।

৪ ,৫ ,৬ মাত্রার তুলনায় ৭ মাত্রায় লেখা কবিতার সংখ্যা খুব কম ।রবীন্দ্রনাথের পরেও অনেকে ৭ মাত্রায় লিখেছেন , তবে আজকাল তেমন একটা দেখিনা ।

একটা উদাহরন দিয়েই কেটে পড়বো :
কে যেন বারেবারে তার
পুরনো নাম ধরে ডাকে ;
বেড়ায় পায়েপায়ে , আর
কাঁধের পরে হাত রাখে ।

ভাঙলে এ রকম --
কে যেন বারেবারে/ তার
পুরনো নাম ধরে /ডাকে ;
বেড়ায় পায়েপায়ে ,/ আর
কাঁধের পরে হাত/ রাখে ।

আপাতত এখানেই শেষ করছি । এরপরে সময় পেলে ছন্দের নানারকম নিরীক্ষা নিয়ে আলোচনার ইচ্ছে আছে । যারা বিষয়গুলো আরও ভালভাবে জানেন , তাঁদের অংশগ্রহণে আরও শিখতে পারবো আশা করি ।

সহায়ক গ্রন্থ -
১। কবিতার ক্লাস - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২। ছন্দের বারান্দা- শঙ্খ ঘোষ
৩। ঈশ্বরীর স্বরচিত ও অন্যান্য নিবন্ধ - বিনয় মজুমদার

অমলেন্দু চন্দ

একটি কাব্যনাট্য – একটি প্রয়াস


[ইডেনের পটভুমি। এ পর্যায়ে চরিত্রেরা ইভ ও আদম।  সময় – ধরা যাক এক অসময়। নিউ টেস্টামেন্ট অনুযায়ী কেইন ও আবেল ছিল আদম ও ইভের দুই সন্তান। কেইন বড়, আবেল ছোট। গল্প দীর্ঘ না করে বলি - কেইন তার ছোট ভাই আবেল কে হত্যা করেছিল , সিব্লিং রাইভ্যালরি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল যে সেটা হেট্রেড বা গভীর ঘৃণায় পর্যবসিত হয়েছিল, এবং একদিন রাগের মাথায় কেইন আবেল কে মেরে ফেলে – দুজনেই তখন যৌবনের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে মানে উনিশ কুড়ি আর কি। এইসব ঘটনা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে ধরা যাক আদম ও ইভ আজকের সময়ের বিথানে এসে দাঁড়িয়ে কথা বলছে – দেখি এখানে!]

ইভ – ইডেনের নিঃসঙ্গতা বয়ে বেরান ক্লান্তিকর, অতএব ...
আদম - কিন্তু সঙ্গম মানেই সৃষ্টি। যে সৃষ্টি আরও কিছু পাপের মতই মনে হয়! অথচ এ পাপ বয়ে বেরাতেই হবে মানুষকে...

ইভ - পাপ ছাড়া সুন্দরের সৃষ্টি হয় না বোধহয়। তাই নিষিদ্ধ ফল আমাকে খেতে হয়েছিল। ফলশ্রুতি পৃথিবীতে নির্বাসন। কিন্তু সে নির্বাসন তো আঁধারে নয়, তাই আলো ছিল, ছিল শব্দ, কথা। বীজমন্ত্রের মত সব শব্দ। ঋষি পরাশর সত্যবতীর সাথে সঙ্গমে পরিতৃপ্ত হল কুয়াশার অঙ্গনে। এল বেদব্যাস। যশোদার কোলে এল সেই সাগ্নিক শিশু। কদমতলায় তোমার হাতে বাঁশী, আমার কাঁখে কলস।

আদম - তারপর কুরুক্ষেত্র

ইভ - সে ক্ষেত্রে ক্লান্তি এল একসময়, তারপর দ্বৈপায়নে বিশ্রাম। অন্যদিকে চেয়ে দেখো, মোজেজ এল, স্বপ্ন দেখাল শহর গড়ার।

আদম – তবুও তো পাপের ইথার রয়েই গেল, এল অপ্সরারা, কিম্বা মধ্যযুগীয় হারেমের পরী,
বা আজকের অলম্বুষা নগরনাগরী –

ইভ - তবুও আবার চেতনা বিশুদ্ধ হল নক্ষত্রের আলোয়। তারারা বলে দিল যীশুর জন্মের কথা। বেথেলহেমের আস্তাবলে। তুমি স্বাগত জানালে তিনজন জ্ঞ্যানী পুরুষকে

আদম - হ্যাঁ, যীশু এল, সঙ্গে এল জুডাস। ক্রুশ রক্তে লাল হল। সময় পেরিয়ে গেল। আইন্সটাইন, ফারমি আইজেনহাওয়ার এল। এল অনু পরমানু বিক্রিয়া। হিরোশিমার কান্না শুনেছ তুমি তারপর। গ্রাম শহর হল, জন্ম দিল বস্তির – অবহেলিত জারজের মত। লিঙ্কন মুমূর্ষু হয়ে গেল, মারক্স এল, ঈশ্বরের মৃত্যু সংবাদ ছাপা হল বুলেতিনে, কিন্তু কি হল তাতে –

ইভ - তবুও মন্দির রয়ে গেল, রয়ে গেল গির্জা মসজিদ সিনাগগ। প্রদীপ মোমবাতি চেরাগ
জ্বলছে নিবছে আবার জ্বলছে। এক আশ্চর্য স্বভাবের ঘেরে মানুষ লালিত হল –

আদম – যাপনের আভঙ্গে এল ধুল আর ধোঁয়াশার অন্ধকার। জীবাণুতে ছেয়ে গেল সভ্যতা।
ফুসফুসে ইদুরের গর্ত, অন্ত্রে ঘা, কোষে ক্লান্তি। জরায়ুতে ভ্রুন হত্যার পীঠস্থান । পতিতালয় বুভুক্ষা বিক্ষোভ বলাৎকার – এ তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পাপের পুনরাবৃত্তি। আমাদের হৃদয়ে হৃদয় নেই, হৃদপিণ্ডে হৃদরোগ জবরদখলী...

ইভ - হ্যাঁ, একচক্ষু হরিনের মত বাঁচার অভিনয়ে তুমি ভুলে গেলে মৃত্যুকেও। অথবা তুমি মরতে পারলে না কারন তুমি বাচতেই শেখনি। চেয়ে দেখলেনা তুমি উদবাস্তুর চোখের জলে পথ পেছল হয়ে গেল, দেশভাগ হলে পরে। ঘর তাঁবু হয়ে গেল। তবুও মানুষ উটের পা নিয়ে মরুজয় করে এল। কেন বুঝলেনা তুমি যে নারকেলের ছোবড়ায় ফাঁদ তৈরি হয়, সে দিয়ে শিশুর দোলনা বানানো হল ।

আদম - কোথায় দাঁড়াতে হবে শেষতক, সেই তো সারে তিন হাত ভরসা

ইভ - মানুষের কি শেষ আছে। সভ্যতার আগুনে মানুষের সমস্ত পাপ ফিনিস্কের মত পুনর্জন্ম পায়। তবুও মনের পাঁকেই অভিলাষের পদ্ম পবিত্র আলোর মুখ দেখে। সে অভিলাষের অঙ্গনে জর্ডন নীল নদ হতে চায় কিম্বা নীল নদ পলি কাঁপা গঙ্গা। সে ইচ্ছার জ্যোৎস্নায় রাম আর রবার্ট কোরান নিয়ে টানাটানি করে, আবার গীতা নিয়ে মগ্ন থাকে রহিম। আজও প্রতিটি মায়ের দুধের মত সব শিশুর হাঁসি উষ্ণ মিষ্টি। এক হাঁটু জলে কিষান আজও বিজধান পোঁতে। বাবুই খড় কুটো ঘাস নিয়ে ঘর বাঁধে।

আদম - কিন্তুর কয়েদি আমরা সবাই – উত্তরের ভিটেতে বাস্তু নেই, বাঁশবন ভরে গেছে।

ইভ - আদম, সব পথ মানুষের পায়ের তোলায় সুখী হতে চায় একটিবার। প্রাপ্তি শুধু পথের অন্তে নয় পথের প্রান্তেও থাকে।

আদম - কোথায় শুরুর শেষ কোথায় শেষের শুরু , আলম্বহীন এই ঝুলে থাকা সত্ত্বার উৎসব নিরাময়হীন এক বিবর্ণ চেতনা

ইভ - শূন্য তবু শূন্য নয়, ঈশ্বরীবর্ষার জল ভরে নাও বিশালাক্ষ চোখে। যন্ত্রণার মেঘ যদি জমে, পুঞ্জীভুত হতে দিও, প্রত্যয়কে করে দিও পাহাড়ি দেওয়াল, দেখবে অন্দর মরু চেরা পুঞ্জী হবেই নিশ্চয়।

[ কৃতজ্ঞতা স্বীকার – আমার জীবনের কিছু অনন্য উপস্থতির কাছে] 
[ চলবে ]

সরদার ফারুক

এবারের ম্যানিফেস্টোঃকবিতা নিয়ে কিছু কথা

বাস্তবে এই প্রশ্নটা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে । বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সুবিধে নিয়ে এবং খুব জনপ্রিয় সোসাল সাইট গুলোর কল্যানে মানুষ এত কবিতা লিখছেন - পড়ছেন - ভাবছেন যে মনে প্রশ্নের চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে কেমন কবিতা আমরা পছন্দ করি ? কী রকম হওয়া উচিত কবিতার শরীর ? এই প্রশ্নগুলো সবাইকে ভাবায় । অনেকদিন হ’ল আধুনিক কবিতার মৃত্যু ঘোষণা করে এসেছে পোস্টমডার্ন কবিতা । বিনির্মাণ ,বিমানবিকীকরণও এখন পুরোনো হয়ে গেছে , তবু পাশ্চাত্যের নানা কাব্য আন্দোলনে আমরা এখনো আলোড়িত হই , চলে অন্ধ অনুকরণেরও মহড়া ।

কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । মানুষের মৌল আবেগগুলো চিরন্তন , যদিও সমস্যাগুলোর চেহারা বদলায় - নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব ঘটে । প্রকরণ ও প্রকাশভঙ্গিতেই সবচে’ বেশি পরিবর্তন লক্ষ করা যায় ।পরিবর্তন যাই হোক - আমাদের পর্যবেক্ষনে কবিতা ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে ।হাজারো কবিযশোপ্রার্থীর অবিরল সাধনা সত্ত্বেও পাঠক কেবল দূরে সরে যাচ্ছে । কবিতার বই ছাপানোর কথা শুনলে প্রকাশক আঁতকে ওঠেন ।তবু নিজের খরচে অসংখ্য বই বেরুচ্ছে , আর কবিরা দেদার সেসব বই পরিচিতজনদের বিলিয়ে দিচ্ছেন ।

আমরা জানি , অগ্রসর কবিতাপাঠে পাঠকের যে যোগ্যতা অর্জন আবশ্যক , সে যোগ্যতা এদেশের তথাকথিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিরল - তবু প্রকৃত পাঠকদের অনেকেও কবিতা পাঠ থেকে আনন্দ নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলেই মনে হয় ।

পাশ্চাত্য কবিতা ভাবনা থেকে আমরা অনেক কিছুই সার্থক ভাবে নিয়েছি ।ফল্ট (চ্যুতি), এসট্রেঞ্জমেন্ট (অপরিচিতিকরন ) শিল্পের ব্যাপ্তি ঘটিয়েছে ।তবু ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে বর্ণিত - ‘রসাত্মক বাক্যই কাব্য’ এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। কবিতা কি আজ তার রস হারাচ্ছে ? কবিতার শরীর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ছবি ও সঙ্গীত ,হারিয়ে যাচ্ছে গন্ধ , বর্ণ , স্পর্শ সহ অন্যান্য সংবেদন? নানা নিরীক্ষার ফলে এক ধরনের চিন্তার উল্লম্ফনকে কবিতা বলে অভিহিত করা হলেও, সেগুলো পাঠককে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ।

কবিতা কোনো নির্দেশনা মানে না,তবু কয়েকটি বিষয় আমরা সবাইকে ভেবে দেখতে বলি -
১/ কবিতায় ছবি, সঙ্গীত (গীতলতা) ফিরিয়ে আনতে হবে। ছন্দ, স্পন্দ, প্রয়োজনে অন্ত্যমিল, অনুপ্রাস সব কিছু দিয়ে কবিতাকে স্মরণযোগ্য করে তুলতে হবে।
২/ কবিতায় স্পর্শ , ঘ্রাণ সহ সকল সংবেদন স্পষ্ট করতে হবে।
৩/ সব মিলিয়ে পাঠককে আমূল নাড়িয়ে দিতে হবে শব্দের শক্তিতে। আমরা জেনেছি ‘শব্দই ব্রহ্ম্’। শব্দে শব্দে বিবাহ দিতে হবে যথাশব্দের ব্যবহারে। কোন শব্দের সাথে কোন শব্দ অনিবার্য, আমরা তা খুঁজে বের করব।
৪/ বাকসংযম অনিবার্য, যে কথা দুই লাইনে বলা যায়, সে কথা দশ লাইনে বলবোনা
৫/ রহস্য ও ব্যঞ্জনা - একাধিক পাঠে ও পাঠকবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের সম্ভাবনা থাকবে কবিতায়।
৬/ মৌলিক আবিষ্কার ও উন্মোচন থাকবে কবিতায়।
৭/ আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস, জীবন সংগ্রাম, যাপিত অভিজ্ঞতা সবই উঠে আসবে শিল্পিতভাবে।
৮/ কবিতা কোন মতবাদিক আদর্শের দাসত্ব করবেনা, যদিও জীবনলগ্ন দর্শন আবশ্যিকভাবেই উঠে আসতে পারে।
১০/ সব মিলিয়ে তৈরী হতে হবে এক অভূতপূর্ব রস - কবিতার রস।

কবিতার জয় হোক, কবিতার পরিবার সুখী হোক। "পারিবারিক" ব্লগ-জিন সকলের সদিচ্ছায় এক অনন্য সাধারণ মাধ্যম হয়ে উঠুক অসংখ্য কবিতার পাঠক পাঠিকা সৃষ্টি করুক - কবিতাকে ভালোবাসবার আত্মিক শুদ্ধতা প্রদান করুক ।

পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

কবিদের ২২গজ


- ১ -

অতিগোপন, আমি দেখছিলাম হাল্কাভাবে,সাধনসঙ্গিনী দেখছিলাম,

চিত্ত মহাসুখে আছে আর আমি কৃষ্ণের চিন্তায় মরে যা্ই,
আসলে কৃষ্ণ তো কবি যুবতী রসের কামনা আসঙ্গের অধিক।
প্রেরণা পরকীয়া দেবে নতুনের স্বাদ, দূতী দেবে সাঙ্খ্যদর্শন
এ যেন সহজ প্রক্রিয়া উপদেশগীতিকার গান, জীবনপ্রবেশে ইচ্ছুক।
‘হৃদয় লজ্জায় ঢাকে হৃদয়ের কথা’ আর আমি কামসূত্র ঢেলে দিই অঙ্গ-অপেরায়
আমি গ্রিক, হাল্কা কুয়াশায় প্রে

মিকার সাথে মিশে যাই গ্রিসের শরীরে
আমি বিকল্প পৃথিবীর আবেগমিশ্রিত উইকেটকিপার
আছি কবিদের হাটে আছি পালকের টুপি মাথায় জ্যান্ত খোলামেলা স্থানান্তরে
আহ্লাদিত, এসব দৃশ্য অপরূপ যৌনচুম্বন নোঙর ফেলেছে, রসে রসে
অপূর্ব কামিনী, আর আমি স্বতঃঘোষিত প্রেমিক, শিল্পসমন্বিত ট্রাজিক ...

(চলবে)


মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট, ২০১২

মুস্তফা কামরুল আখতার

এক চন্দ্রাভিসারী মানুষ ও হিমু-মিসির আলী

হিমু বা মিসির আলির রহস্যময় পথে হেঁটে
জগতের অদ্ভুত রহস্যময়তা ভেদ করে
মানবমনের অতি গভীরে ঢুকে যাবেন না আর,
একজন চন্দ্রালোকিত মানুষ ।
চিন্তাগুলোকে প্রকাশের যে ধরণ চিরকালীন,
তার বাইরে গিয়ে অসম্ভব সরল গলায়
আর কেউ স্পর্শ করবেন না আমাদের মন ।
বৃষ্টিদিনে ভেজা পথে খালি পায়ে হিমু
আর জট ছড়াবে না জটিল মানুষগুলোর ...
মিসির আলি আর দেখবেন না, -
অতি রূপবতী এক মানুষের কী অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক
জীবনের পেছনে এক অন্যরকম চন্দ্রালোক ।
চন্দ্রগীতি গাইতে গাইতে তার চরিত্রগুলো আর দেখবে না,
জোছনা রাতে 'সবাই গেছে বনে' ।
কেন চলে গেলেন ! কেন ! ...

অদেখা এক মানুষ কী ভাবে সত্বায় এভাবে প্রোথিত হলেন ? ...
চোখভরা আর্তি আর জল বলে,
এই জগতের রহস্যময়তার কতটুকুই আমরা বুঝি ?


অনেক লেখা স্মৃতিতে জমতে জমতে ...
একদিন এক মানুষ জীবনে এলেন ।
কতগুলো কালো হরফে মাথার ভেতরে গড়ে ওঠা
এক পথকে বদলে দিতে । দিলেনও ।
অনেক বদলালেন । অসামান্য এক পথ তৈরি করে,
ঝিমঝিম এক মায়াজাল আবার নতুন ভাবে
নতুন মস্তিষ্ক বানিয়ে দিলেন ।

শোনালেন এক অসাধারণ চন্দ্রগীতি,-
'ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়য়,
চাননি পশর রাইতে যেন আমার মরণ হয় ।'
জোছনায়, চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে
পথে চলার দৃশ্য এঁকে দিলেন,
অপার্থিব সুন্দর, যা নেই তা না ভাবতে ।
ভাবতে, যে ভাবে ঘটে । বোঝালেন, আশপাশ আর
চরিত্রগুলোকে চিত্রিত করতে, আর চিনতে ।

বিন্দু বিন্দু করে এক মোহময় বিভ্রম
আমায় গড়ে তুলেছিল এক চন্দ্রাভিসারী মানুষ ।
একদিন শক্ত হাতে তুলে নিয়েছিলাম বৈঠা ...
এক দুরাভিমুখী জলের ধারা বেয়ে
ছুঁয়ে দিতে তুমুল জোছনার গা ।
কখন, কে আমার মনে জোছনার
স্বপ্নীল তরলে কষ্ট ভাসিয়ে দিতে শিখিয়েছিলেন !
তার চাইতেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, - শিখেছিলাম ।

আজ মনে পড়ছে, সজল চোখেও
চন্দ্রকথায় হয়ে ওঠা যায় স্বপ্নচারী অসমসাহস ।
যিনি শেখালেন, তাকে বুকে রেখেই সরল চোখে
দেখে যেতে চাই পৃথিবীর গা বেয়ে পড়ছে
এক শুভ্র সুন্দর কল্যাণের ধারা ।
তিমিরে তীব্র জোছনার প্লাবন ।

( নন্দিত লেখক হুমায়ুন আহমেদের স্মরণে লেখা )



সিদ্ধার্থ শর্মা

নীলু - সীমান্ত
ভালবাসার মনিকোঠায়

একটি ব্যক্তিগত সংলাপ :

নীলু: সীমান্ত আমাকে বোলবে তুমি - কেন গত পক্ষকাল ধরে আমার আঙ্গিনায় বিষাদ পাখি বিরহের করুন কবিতা শোনায়?


সীমান্ত: তুমি কি জাননা মিলনের থেকেও বিরহ তোমাকে অনেক কাছে টানে আমায়? নিষ্প্রদীপ থেকে তোমার ভালবাসার স্নিগ্ধ আলোকে নিজেকে আলোকিত দেখি ...(নীলু তখন সীমান্তর দুই বাহুর বাঁধনে বক্ষলগ্না তিরতির করে কাঁপা দিশেহারা)

নীলু: তুমি তো অমনি-ই কিছু বলে দাও যাও এখন ছাড়ো .. আমার অবস্থা কি একটুও অনুভব করতে পারো?


সীমান্ত: সংজ্ঞাহীন অচেতন মন্দ্রিত আবেশে / স্বপ্নাচ্ছন্ন লাবন্যপুঞ্জে মদিরা নেশাতে মিশে / আকন্ঠ নিমজ্জিত প্রতিক্ষণে ভালোবেসে / অবাক অনুভবে সবাক মেঘাছন্ন প্রদেশে ...

নীলু: আমি জানিনা! জানিনা!! জানিনা!!! ... কবিতা ছাড়ো .... আমাকে নির্বাক করে দাও আদরের আবেশে...


সীমান্ত: এসো তবে করে দেই নির্বাক ওষ্ঠে ওষ্ঠ মিলিয়ে / মন পর্যন্ত পৌছে যাব শরীরী গলিঘুঁজি পেরিয়ে (অসম্ভব প্রত্যয়ী সীমান্ত নীলুর শরীরে মন খুঁজতে ব্যগ্র হয়ে পড়ে )

নীলু: আজ তোমার ভালবাসার আদরে ডুববো কবি / দেখব কেমনে আঁকো ভালবাসার ছবি / দিলেম তোমায় শরীরী ক্যানভাস দিলেম মনের রঙ / দেখি কেমনে সাজাতে পারো আমায় হয়ে আছি জবরজং / (নীলুর অসম্ভব সুন্দর দুটি গর্বিত চোখ তাকিয়ে থাকে সীমান্তর মুখে ... ওর লাজে রাঙা গাল / মনে করায় ভৈরবী উষাকাল )


সীমান্ত: দেখ চেয়ে আকাশে উড়ন্ত গাঙচিল / গভীর দৃষ্টিতে তোমার রহস্যের ঝীল / অবুঝ অভিমানী একটি মন / চুরি করে দেখে নেয় তোমার স্বপন / তিল তিল করে গড়ে তোলা তোমার যৌবন / আজ বিধিনিষেধ ভেঙ্গে ভালবাসার তপোবন / ইতি উতি ফুটে ওঠা মৌ মাখা সুগন্ধি রঙ বেরঙ্গি ফুল / সব্বনাসী নেশায় মাতিয়ে নেয় গুনগুনিয়ে অলিকুল / ফেরারী মন আজ দ্বার খুলে অপেক্ষায় গোনে প্রহর / তৃপ্ত হতে ...পূর্ণ হতে অতৃপ্ত অপূর্ণ কামনার কৃষ্ণ গহ্বর / (সীমান্ত অনেক অনেক সাহসী..)

নীলু: এক মুঠো জোছনা এনে দেবো / দেবো এক ঘড়া পবিত্র মেঘের জল / এক বুক ভালোবাসাতে ভরাবো / ভালবাসা পেয়ে ভালবাসা দিয়ে করবো জীবন সফল /

সীমান্ত: তোমায় পেলে - পাই না তল / স্তম্ভিত চাঁদের চোখে জল / জোছনা আমার ঘরে / বিছানা আলোকিত করে / উদ্বেলিত আলোকিত উজ্জ্বল / ভালবাসার পদ্ম কুঁড়ি দুটি / চুম্বন স্পর্শে রোমহর্ষে ফুটি / জানায় সনির্বন্ধ মিলন আকুতি / জাগাতে কিশলয়ী শরীর / সবুজ অবুঝ মন অধীর / উত্তাপের বাষ্পে সৃষ্টি করবো মেঘ / পুঞ্জিভূত আকাঙ্খিত মিলনের আবেগ ...


নীলু: প্লিজ সীমান্ত আমাকে এভাবে আদর দিয়ে পাগল কোরনা তুমি - শেষে পাগলিকে সকলে .....(নীলু অধীর)


সীমান্ত: পাগলামি যদি বিন্দাস পাগলামি হয় - বিশুদ্ধতায় পাগলি আমার সবচেয়ে প্রিয় ...../ তাকে নাইয়ে খাইয়ে চুল আঁচড়িয়ে - কপালে সব্বনাসী লাল টিপ এঁকে দিয়ে - ঠোঁটে গাড় লিপস্টিক দিয়ে লাল ঠোঁটের টিয়া করে আমার মনের সবুজ বনে ছেড়ে দেই - সে মনের সুখে উড়ে বেড়াক - ঘুরে বেড়াক পাগলামিতে এরকম অনুভব পাই তাতেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই ...

নীলু: অবুঝ মনে সবুজ টিয়া / সবুজ বনে অবুঝ হিয়া / এত কেন ভালোবাসো - এত কেন কাছে ডাকো? / কল্পনাতে কাছে আসো - আমাকে কি স্বপ্নে দেখ?


সীমান্ত: তুমি স্বপ্ন নও - তুমি স্বপ্নিল / তুমি ভালবাসা-র ঝিল / তোমাতেই ঝাপিয়ে পড়ে উড়ন্ত শঙ্খচিল / তুমি কল্পনা নও - তুমি কল্পিত / তুমি আহ্লাদিতা নারী চুম্বিত / অস্থিরতা কাটাতে আবেগে মথিত নিস্পেষিত / তোমাকেই আঘাত করে বারবার দুরন্ত শঙ্খচিল / চুম্বন পান শেষে ভালবাসার যন্ত্রনায় তুমি নীল


নীলু: আমি নীলু - আমি সীমান্তর নীল আকাশ ... আমি সীমান্তর নিশ্বাসের বাতাস সীমান্ত: তুমি আমার প্রতিবিম্ব - তুমি বিশ্বাস ... তুমি উচ্ছ্বাস ....তুমি এহসাস ...


সীমান্ত: চাঁদ না ছুঁয়ে বুঝিনি উত্তাপ / সূর্য্য চিরদিন-ই আমার কাছে নিরুত্তাপ / চাঁদের সারা শরীরে আমার ভালবাসার ছাপ ...

নীলু: তুমি একটি আস্ত বদমাস! সেই সন্ধ্যেটা আজও মনে আছে? , সেই চাপ আজও মনে আছে?.


সীমান্ত: উজ্জ্বল নীলাভ সন্ধ্যায় / সিক্ত বসনে আহ্লাদী ভালবাসায় / এলো চুলে ঢাকা দেহবল্লরী সীমা রেখায় / আজ-ও আমাকে উদ্বুদ্ধ করে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখায় ...

নীলু: তুমি কি জানো? রোম রোম শিহরণে কেঁপে কেঁপে ওঠে / আজও প্রথম দংশন স্পর্শ পাই আমার ঠোঁটে [:)]


সীমান্ত: তুমি থাকো ... তো ঝিমলী সোনাল জড়িয়ে আমার সাথে / বৃষ্টিতে ভিজে তোমার সাথে মন জড়িয়ে থাকে পাকে পাকে / টুপ টুপ ঝরে পড়া শিশির কিংবা মন কেমন করা জোছনা আলো / তোমারে আপন করে কাছে টেনে নিল - আরেকটু আদরে ভরে দিলো - ভালোবাসাতে ভরে নিল ...


নীলু: সীমান্ত আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে / আমার মনের কথা তোমার মনে কেমনে প্রকাশ পাচ্ছে / এক ছুটে তোমার কাছে পৌছে যেতে ইচ্ছে করছে ...

সীমান্ত: সোনাই দিঘী ... আমার কাছে এসো... আমার বুকে এসে মেশ ... নীলু: আর-ও কত কাছে চাও আমায়? / কেন বার বার এভাবে আমায় জড়াও? ...

সীমান্ত: ঠোঁট ছুঁয়ে দেই চোখে / পৌঁছে দেই প্রেমের অমৃতলোকে...

নীলু: আমার সব কান্না ধুয়ে নাও তোমার ঠোঁট দিয়ে / এভাবেই থাকো শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে / তোমার সরলতা দিয়ে জটিলতার আবর্ত থেকে সরিয়ে / সব অনুভব সব পুরুষ আমার মনে ঝরিয়ে / দাও আমায় কানায় কানায় পূর্ণ করে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরিয়ে / আমি নারী - এই অনুভব ভীষণ ভীষণ মনে করিয়ে ...

সীমান্ত: ভালবাসা আমাকে জটিলতা ছেড়ে সরল হতে শিখিয়েছে / পাহাড়ি নদীর মত স্বচ্ছ সুন্দর প্রবাহ দিয়েছে / ভালবাসার নীলু মনকে কাছে টেনে নিয়েছে / হারিয়ে যাওয়া জীবন আবার আবেগ ঘন অনুভবে ফিরিয়েছে ...

---