কবিতার পরিবারের একমাত্র ব্লগজিন

এখনও পর্যন্ত  Website counter  জন ব্লগটি দেখেছেন।
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৩

ছোটগল্প - নরেশ মণ্ডল

মুখোমুখি
নরেশ মণ্ডল



অনেক্ষণ বসেছিলম মুখোমুখি। কোনো কথা নেই। পরস্পর কেমন যেন চুপ মেরে আছি।

কেন ? ঠিক বুঝতে পারছি না। আছি এটা অনুভব করতে পারছি। একটা নীরবতা গ্রাস করে নিচ্ছে আমকে।জানি না অন্যজন কেমন আছে। কারণ আমরা কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারি না। শত চেষ্টা শর্তেও।কোনো শব্দও শুনতে পাই না। অনুভব করতে পারি আছি। মন উজার হওয়া কথাগুলো ভাসতে থাকে চোখের সামনে। পাহাড় ধোয়া জলও ছোঁয়া যায়। অথচ শব্দগুলো কেমন ভেসে যাচ্ছে সাবলীল ভাবে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাকে দেখতে পাচ্ছি। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কখনও আনমনা ভাবে পাশ পাশ ফিরে অন্যদিকে চেয়ে আছে। সে যেভাবে দেখাবে আমাকে তাই দেখতে হবে। আমার মতো করে আমি তাকে দেখতে পাবো না। তাকে হাসবার কথা জানাতে পারি। সে হেসে কুটিকুটি হতে পারে। আমিও হাসতে পারি।ভীষণ জোরে গলা ফাটিয়ে। পাশের বাড়ির প্রতিবেশি ফোন করতে পারেন। সুস্থ আছি কিনা জানতে আগ্রহী হতে পারেন। নীলা বৌদির মিষ্টি রিনিঝিনি গলা কানির কাছে বেজে উঠতে পারে। কি ব‌্যাপার এত এত রাতে! গলা আরো আরো মোলায়াম হপে পারে। গাঢ় স্বর পাশের ফ্ল‌্যাট থেকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমি ভাসছি মেঘের ভেলায়। সে কোন নদীর ধারে। কিংবা নির্জন রাস্তার ধারে উঁচু দক্ষিণ খোলা

কোণে। হুস করে দ্রুতগামী কোনো গাড়ি পার হয়। কোনো অজানা পাখি ডেকে যায় উড়ে।

মারুফার বিস্ময়ে হাসে। কপালের টিপটা আলগা হয়নি এখনো । কপালের চুলগুলো দুষ্টু বাতাসে এলোমেলো করে যায়। বাঁ হাত কপাল ছুঁয়ে ঠিক করে নিতে চায়। শব্দকে বহ্ম বলে। আমি ঠিক জানি না। ছোটো খাটো শব্দগুলো ফুল হয়ে ভাসে। হাসনুহানা, গোলাপ, কামিনী', জুঁই মারুফার ছুঁয়ে আছে। কত শত মালা গাঁথা হয়।প্রতিদিন। জীবনযাপনের টুং টাং ভেঙে পড়া বোধ রুচি জমা হয় রিসাইকেলবিনে। ঘেঁটে দেখার সময় বড় কম। জমতে থাকা ঝুড়িটা একদিন কেউ না কেউ সাফ করে দেয়। ফিরে দেখে ক’জন! আমার ফুলের সুবাস নিলে না তুমি। আসলে তুমি নিতে পারো কিনা সেটাই জানা হয়ে ওঠে না। তোমার ফুলের সুবাসও আমি নিতে পারিনি। কোনো না কোনো কারণে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। হাত ধরে হাঁটি। আইসক্রিমে গাল ভরিয়ে পেসট্রিটে কামড়। কিছু একটা করব বলে টলটলে পায়ে ফিলটারেই ধরায় আগুন।

শূন্যটা গ্রাস করে আছে। আমাদের একত্র জীবনযাপনের ফাঁক গলে আমরাই কখন হয়ে উঠি অন্য মানুষ।আমাদের ছোটোকাল, উনিশ-কুড়ি জানা হয় না। জানতে চাই না বা জানাই না।

গোপনতা জমে থাকে নিজস্ব গোপন কুঠুরিতে। কালাধারে। কিছুটা অচেনাই থেকে যাই। বের হলে কখনও বিপন্নতা। সেখানেই মুখোমুখি। অন্য কোনো মুখ আর এক মুখের কাছে আসে। জানি না। অচেনা চেনা হয় দূর থেকেই। না জানা বাড়তে থাকে। তখনই....

-ভালো আছো?

-তুমি?

-ভালো। তোমার কবিতার অনুষ্ঠানটা কেমন হলো।

-বেশ ভালো হয়েছে। অনেকেই বেশ খুশি । কেউ কেউ এসে অভিনন্দন জানিয়ে গেল।

-তাহলে খুব ভালো হয়েছে বলো। তুমিতো খুব চিন্তায় ছিলে। বলে ছিলাম না মনে জোর আনো। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি এখান থেকে তোমাকে আর কতটা সাহায্য করতে পারি। কিছু বইয়ের খবর দিতে পারি। কিন্তু জোগাড় তোমাকেই করতে হয়েছে। আমি এক প্রান্তে আর তুমি কোথায়। অন্য দেশে। তবু আমরা কত কাছে। মনে হয় তোমার নিঃশ্বাসের শব্দও আমি পাই। কোন ফুলের অভিনন্দন নেবে তুমি। তোমার ঘরের রঙ জানি না। কোন ফুলে সাজানো ঘর। তোমার পরিবারপরিজন কিছুই জানি না আমি। তুমিও জানো না। কখনো কারো ছবি দেখোছো। যেমন আমিও। এখানেই মুখোমুখি চেনা। বসে থাকা। তির তির করে বয়ে যায় শব্দ। একটা ক‌্যানভাস ক্রমশ রঙিন থেকে রঙিন হয়।

তুলির টানে গড়েওঠে অবয়ব। কুলকুলে নদী এক পার ভেঙে গড়েতোলে নিজস্ব ভূমি। সেই

অন্যভূবনে দুজন মুখোমুখি ছাড়া নেই অন্য কোনো মানুষ। পাখা মেলে অন্য জগৎ। নিজস্ব গোপনতা ভাঙে।মনের শূন্যতা ক‌্যানভাস ভরায় রঙের গভীরতায়। রাত গভীর হয় মুখোমুখি তুলি হাতে আমরা দুজন।তোমার পিছনে নেই অন্য চোখ। আমারও। দেশের গণ্ডী ছেড়ে অন্যখানে আর এক মানুষ। প্রজাপতি মেলে রঙ। চেনা জন দেখে না মেলে চোখ।

হালকা নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থাকো ব‌্যালকনিতে। আমি তোমায় ঠিক দেখে নেব। তোমার ছড়ানো চুলের জুঁই গন্ধ ঠিক পেয়ে গেছি আমি। মারুফার চাঁদের আলো তোমাকে ছুঁয়ে যাবে।

আমার আগে কেউ তোমাকে ছুঁয়ে যাক চাই না আমি।


এবার পি সি-র আলো নিভে যাক। কাল আবার। এই পৃথিবীটা আমাদেরই থাক।

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৩

ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্তা



অথ অহি – নকুল কথা


অহিভূষণ ঘোষ আর নকুলচরন বোস,ছেলেবেলার  বন্ধু। সুজনেরা বলে “মানিকজোড়। সম্প্রতি অহিভূষণের ছেলে অজয়ের সাথে নকুলচরনের মেয়ে নম্রতার বিয়ের কথা চলছে।

অজয় চশমা পড়া পড়ুয়া মানুষ, আর নম্রতা ? সারাদিন বকমবকম কথা, খিলখিলে হাসি। বইপোকা অজয় অনেক ভেবেচিন্তে, বন্ধু বান্ধবের সাথে শলা পরামর্শ করে, যেই না একদিন নম্রতাকে বলেছে
-“আমি তোকে খুব ভালোবাসি নমি, আমায় বিয়ে করবি?”,
অমনি নম্রতা হাসতে হাসতে উল্টে পড়ে আর কি,টানা আধ ঘন্টা খিলিলিয়ে গা জ্বালানো হাসির পর নম্রতা জানালো সে রাজি, তবে একটা শর্ত আছে।অজয় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।একটা মোটে শর্ত তো? অত মিষ্টি মেয়ের এইটুকু দাবী তো মানাই যায়

এরপর আর কি!! ওরা চুটিয়ে প্রেম করল দু’বছর। অবশেষে একদিন অহিভূষণ বাবু ছেলেকে ডেকে পাঠিয়ে, গলা টলা ঝেড়ে কপট গম্ভীর গলায় বললেন,_'দেখো বাপু, অনেক হয়েছে। পাড়ার লোকে বড় কানাকনি করছে। এবার আমি তোমাদের বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই, তুমি কি বলো?

অজয়ও দৌড়ালো তার নমিকে এই হাতে গরম সুখবরটি দিতে। খবরটা শুনে নমি কিছুক্ষন ভাবলো বলবে কি বলবে না, অথবা কি বলবে সেটাই বোধহয় মনে মনে ভেবে নিলো। তারপর মুখ তুলে বলল
-আমি বিয়ের পরে বাবা মাকে ছেড়ে পাকাপাকিভাবে অন্যকোথাও শ্বশুরবাড়ীর কনে বউটি সেজে থাকতে পারবো না, বাবা মাকে বুড়ো বয়সে দেখবে কে? আমার তো অন্য ভাইবোন নেই। তুমি বাড়ীতে কথাটা বুঝিয়ে বোলো। আর হ্যাঁ, এটাই ছিলো আমার শর্ত,তুমি না শুনেই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলে।

আচমকা নম্রতার এ হেন শর্ত অজয়কে রীতিমত চিন্তায়ফেললো। আক্ষরিক ভাবে এখন ওর দশা, শ্যাম (উপসসস্, রাধা) রাখি না কূল? ।তারপর আর কি! নম্রতার শর্ত মেনে দু’বাড়ীর গিন্নীদের আর নকুলবাবুর ঐকান্তিক আগ্রহ ও সম্মতিতে এবং অহিবাবুর চুড়ান্ত বিরোধিতা ও অসম্মতিতে বিয়েটা হয়ে গেল বটে তবে কিনা অহিভূষণ ঘোষ আর নকুলচরন বোসের,ছেলেবেলার বন্ধুত্বটা এখন আক্ষরিক অহি-নকুল সম্পর্ক হয়েই দাঁড়িয়েছে।

ছোটগল্প - মেহেদী হাসান

উৎসব



শীতের বিষণ্ণ দুপুর- ভরপেট খেয়ে আরামের ঘুম দিয়েছে রাসেল। গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সমস্ত শরীর একটা পুরু কম্বলে ঢাকা। দরজা-জানালা সব এঁটে বন্ধ করে দেয়া-পুরো ঘর জুড়ে যেন কবরের ঘন নিস্তব্ধতা। রাসেল ঘুমের অতলে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সুখ স্বপ্নে, স্বপ্ন প্রাঙ্গনের এক কোনায় হঠাৎ সে দেখতে পেল দুইজন লোক নিজেদের ভেতর কি একটা রহস্যজনক বিষয় নিয়ে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। তাদের এই ফিসফিস শব্দ শুনে কোথা থেকে যেন আরেকজন লোক এসে যোগ দিল। ফিসফিসানির শব্দ ধীরে ধীরে গুঞ্জনে পরিণত হতে থাকে। তারপর দুই দিক থেকে দুইজন, এপাশ থেকে তিনজন, ওপাশ থেকে আরো চারজন- এভাবে আস্তে আস্তে চতুর্দিক থেকে অনেক মানুষ এসে জড়ো হতে লাগল। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের মত গর্জন করতে করতে দল বেঁধে আসছে সবাই। গুঞ্জন বাড়তে বাড়তে কোলাহলে পরিনত হয়ে স্বপ্নের ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করে বৃহৎ বাস্তবের উঠানে এসে পড়ল।

রাসেলের মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ভাব, আড়ষ্ট চোখের পাতা খুলতে কষ্ট হচ্ছে; শরীরটা যেন এখনও শুয়ে আছে ঘুমের বিছানাতেই। চতুর্দিক থেকে তীব্র কোলাহল, বিকট চিৎকার, ছোঁয়াচে চেঁচামেচি, হল্লা দিয়ে কান্না, বুক থাপড়ানো হাহাকার, অস্ফুট ধ্বনি, অস্পষ্ট বিভিন্ন ধরনের শব্দ তার কানের পর্দায় ঠাস ঠাস করে আঘাত করছে!

উঠান ভর্তি দিকভ্রান্ত মানুষ পাগলের মত এদিক সেদিক ছুটছে। প্রায় সবারই হাতে-পায়ে, মুখে, মাথার চুলে- শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পিচ্ছিল কাদা। অধিকাংশ পুরুষের লুঙ্গি মালকোছা মারা, মহিলাদের শাড়ীর আঁচল ঘাড়-বুক থেকে খসে গেছে অনেক আগেই, যাদের পরনে ব্লাউজ নেই, আথালি-পাথালি হাঁটাচলা ও দৌড়-ঝাপের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের ঝুলে পড়া স্তন জোড়ার লাফঝাঁপ দেখে অনেক ভদ্র লোকেরই বিবমিষা উদ্রেক করবে। ছিমছাম কয়েকটি ছাত্র ছোকরা জনতার দঙ্গল থেকে সাবধানে গা বাঁচিয়ে উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। গ্রামের মুরুব্বীদের অবাক চোখে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে করতে মাথার চুল ধরে টানার দৃশ্য দেখেও বোঝার উপায় নেই ঘটনাটা আসলে কি! কিশোরী মেয়েদের চুলের খোপা খসে গিয়ে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত এ ঘাড় থেকে ও ঘাড় পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ানোর সৌন্দর্য এরকম সময়েও অনেকেই মোহিত করবে বলেই মনে হয়। উঠানের সামনের দিক দিয়ে অবিরত ভাবে লোকজন বের হয়ে যেতে থাকলেও উঠানে কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না কারন চরাক্ষেত থেকে পুকুরের ধার দিয়ে দীর্ঘ মিছিলের লেজের মত লোকজন হাঁপাতে হাঁপাতে উঠোনে এসে যেন অনেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

রাসেল যাকে হাতের কাছে পেল তাকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল, কি অইছে আপনারা এমন করতাছেন ক্যা? দোহাই লাগে ঘটনাটা খুইলা কইন। আপনেগো ব্যাপার স্যাপার আমি কিছুই বুঝতাছিনা। আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে, আমারে কইন কি অইছে, দেহি কি করন যায়; দয়া কইরা শান্ত অইন। অস্থির অইন না জানি, আমার ঘরে আইয়া বইয়া কইন ঘটনা কি অইছে। ঘটনাটা খুলে বলা তো দূরের কথা রাসেলের দিকে কেউ একটি বারের জন্য ভ্রুক্ষেপও করলনা। তার আত্মসন্মান বড় ধরনের একটি ঘা খেল, অহংকার মূর্ছিত হয়ে রইল কিছুক্ষণের জন্য। সে ক্রুদ্ধ হয়ে সামনের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো। ফুলে উঠা রাগ কোন দিক দিয়ে বের হবার সুযোগ না পেয়ে বুকের ভেতর গজগজ করতে থাকে।

কটি বয়স্কা নারী, হাঁপাতে হাঁপাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলল, এডা লুঙ্গি দেও বাবা; তাড়াতাড়ি এডা লুঙ্গি ঘর থিক্যা বাইর কইরা আনো। অর লুঙ্গির মধ্যে ক্যাদা নাইগা বোঝাই অইয়া গেছে গা। মহিলাটি রাসেলের দুঃসম্পর্কীয় আপা লাগলেও নির্দিদ্ধায় তাকে বাবা সম্বোধন করতে একটুও আটকালনা। এ রকম কোলাহলের মধ্যে কাউকে কোনকিছু দিলে তা ফেরত পাওয়ার আশা করা বোকামী। ঘরে তো কোন লুঙ্গি নাই, লুঙ্গি দিয়া কি অইব? আইচ্ছা ঘটনাটা কি অইছে আমারে খুইলা কইনছে। মহিলাটি শুধু বলতে পারলো, আমাগো শামীমেরে কারেন্টে ধরছে গো---কারেন্টে ধরছে। মরতাছে গো মরতাছে—কারেন্টে ধইরা মরতাছে! মহিলাটি আবার হাঁপাতে হাঁপাতে জনস্রোতের সাথে মিশে গিয়ে পাগলের মত দু হাত দিয়ে মানুষজন সরাতে সরাতে সামনের দিকে এগুতে লাগলো। রাসেলও সাথে সাথেই মহিলাটির পিছনে লাগালো এক ছুট। কিছুটা নিজের চেষ্টায় আর কিছুটা লোকজনের ধাক্কায় গ্রামের ভেতরের ছোট রাস্তাটি ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে নদীর ধার ঘেঁষে পাকা রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

মালকোছা মারা মোটাসোটা জোয়ান একজন অচেতন মানুষকে ভ্যানের উপর রেখে দশ-বারোজন লোক চতুর্দিকে ঘিরে ধরে ঘাড়ের নিচ থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্রত্যেকটি জায়গায় চোখ মুখের মধ্যে একধরনের সহানুভূতির ভাব জাগিয়ে রেখে বৃষ্টির ধারা-বর্ষণের মত কিল, ঘুষি, থাপ্পড় এমনকি মাঝে মাঝে পা উপরে তুলে লাথি পর্যন্ত মেরে চলছে। মারতে মারতে তারা অনেকেই প্রচন্ড রকমের ক্লান্ত, শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে। বালক বয়সের ছেলেরা যারা শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংশ পেশী টিপে দিচ্ছিল তাদের অনেকেরই চোখে মুখে হঠাৎ হঠাৎ দু একটা কিল থাপ্পর এসে লাগতেই তারা কিছুটা খেকিয়ে উঠে আবার শরীর টিপতে শুরু করে দেয়। এই অবিরত কিল, ঘুষি, থাপ্পর, লাত্থির চোটে নাকি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লোকটির শরীরের জমাট বাঁধা রক্ত চলাচল করতে শুরু করবে। তাতে করে লোকটি হয়তো বেঁচেও উঠতে পারে!

শামীমের উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ কালো কুচকুচে হয়ে গেছে, বুকের বাম পাশে একটি নাতিদীর্ঘ সদ্যপোড়া দাগ, মুখটি ভাবলেশহীন, বাঁ-হাতটি শরীরের একপাশে নিথর হয়ে পড়ে আছে। ডানহাতটি শিথিল ভাবে মুঠ করা, আঙ্গুলগুলো কুকড়ে কিছুটা বাঁকা হয়ে গেছে। ধরেই সাথে সাথে ছেড়ে দেওয়ার একটি চেষ্টার ছবি আঙ্গুল কয়েকটির মধ্যে এখনও অনেকটা স্পষ্ট। ঠোঁটের বাম পাশের কোনা দিয়ে বের হওয়া গ্যাঁজলা দেখে মেয়েরা মুখে কাপড় চাপা দেয়। চোখের পাতা দুটি হাট করে খোলা, ঘোলা চোখে বাঁচার আকুতিটিও যেন ইতিমধ্যে মরে গেছে।

ইলেকট্রিসিটির তার দিয়ে নগর জীবনের অনেক বিষয়ই গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে আজকাল। অজ পাড়া গ্রামগুলোতেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিহত ভাবে। রাষ্ট্র এখন সমাজের বেড়া ডিঙ্গিয়ে মানুষের ঘরের ভেতরটা পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায়। রেজিষ্টার্ড ডাক্তার কতৃক মৃত ঘোষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ সাহস করে বলতেই পারলোনা, মৃত মানুষটিকে কেন শুধু শুধু টানা হেঁচড়া করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছো?

শামীমের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাবার পর টানা তিন দিন ধরে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় টানা বর্ষনের মত আলোচনা চলতে লাগল। পুরো গ্রামটি যেন তিনদিনধরে শামীমের মৃত্যু ঘটনার উপর ধলি বকের মত একপায়ে দাঁড়িয়ে শোকের পুঁটিমাছ খুটে খুটে খেতে থাকে। চরা ক্ষেতে আলের ধারে, পেকা জমিতে গোছা গাড়ার সময়, নদীর পাড়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে, সকালে দুপুরে রাত্রে খাবার খেতে খেতে এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকার নিভৃত দেখা সাক্ষাতের সময়ও একই আলোচনা। স্বামী-স্ত্রী গভীর রাতে তাদের নিজস্ব উত্তেজনার সময়, উত্তেজনা শেষে রণক্লান্ত অবস্থায় দুইদিকে মুখ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তেও শামীমের কালো হয়ে যাওয়া মুখটা স্মরনে আনে। তখন তাদের বুকের ভেতরে কি যেন একটা ইস্ক্রুপের মত মোচড় দিয়ে কলিজার ভেতর ঘচ করে ঢুকে পড়ে। পাড়াবেড়ানী বয়স্কা নারীরা তো এই ঘটনা আচলের খুঁটে বেঁধে শরীরে নতুন উদ্যমের গন্ধ মেখে বাড়ীর পর বাড়ী হেঁটে বেড়ায়। ছাত্র ছোকরারা সাইকেলে চড়ে স্কুল কলেজে যাওয়ার সময় শামীমের বিষয়ে আলোচনায় মনোযোগী হয়ে এবড়োথ্যাবড়ো পাকা রাস্তায় হঠাৎ উল্টে পড়ে। কিশোরী মেয়েরা উঠোনের মাঝখানে দাগ দিয়ে এক্কাদোক্কা খেলার মাঝখানে শামীমের চটুল টিটকিরির কথা মনে করে দম ভুলে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। তাসের আড্ডায় তাস বাটা ভুলে গিয়ে চলতে থাকে তাস খেলায় শামীমের অপটু বিষয়ে আলোচনা। মদ খাওয়ার অভ্যাস যাদের একটু- আধটু আছে তারা শোকে কাতর হয়ে গড়ের ভেতর গারো পাড়ায় বাংলা মদের আসর জমায়, তাতে করে শীতের রাত্রে এদের শরীরও একটু গরম হয়। শামীমের স্মৃতিকে স্মরন করে মদের গ্লাশ ঠোটে ছোঁয়ানোর সময় মাতাল হওয়ার বদলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে অনেকেই। শীতের রাত্রে বদ্ধ ঘরে আমেজ করে বসা জুয়ার আসরে টাকার লেনদেনের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নীরসমুখে শামীমের সাথে ঘটে যাওয়া খন্ড ঘটনাগুলো আলোচনা করতে থাকে গ্রামের সব পাকা-পাকা জুয়াড়িরা।

শোকের সময় ঢিমেতালে গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে যেতে থাকে। শামীমের এই মৃত্যু শোক মানুষের কাজে-চলাফেরায় তেমন কোন ব্যাঘাত ঘটায় বলে মনে হয় না। এবং কখনো সখনো শুধু আড্ডার আমেজই বাড়িয়ে চলে। শোক মানুষের চতুর্দিকে হালকা ধোঁয়ার কুন্ডলীর মত ঘিরে থাকে, শুধু বয়ে চলার সাথে মেপে মেপে খানিকটা করে উড়ে যেতে দেখা যায়।

ঠান্ডা আমেজের বিকেল বেলায় শামীমের জানাজা শেষ করে জাহিদ চা স্টলে আসলে- ছোটরা তার বসার জন্য বেঞ্চের খানিকটা জায়গা খালি করে দেয়। এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে দিয়ে কিছুটা কুঁজো হয়ে জাহিদ বসে পড়ে আস্তে করে। চা স্টলে ইতিমধ্যেই জানাজা শেষ করে ছোট বড় অনেকেই ভিড় জমিয়েছে- তাদের প্রায় সবার মাথাতেই জানাজার সময় পড়া টুপিটি এখনো আছে। শুধু মাত্র জাহিদই জানাজা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সার্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে। অনেক ক্ষণ বিষণ্ণ থাকতে থাকতে টুপি মাথায় দেওয়া সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বিষন্নতাকে মাটি চাপা দিতেই সবাই এই ছোট চা স্টলটিতে এসে হাজির হয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই চা স্টলের ছোট পরিসরটি হা হুতাশ আর দীর্ঘশ্বাসে জমজমাট হয়ে উঠে। আর জাহিদের বুকের ভেতর থরে থরে সাজানো ক্ষোভ-এই শোকাবহ পরিবেশে বের হওয়ার জায়গা না পেয়ে বুকের ভেতরে আকুলি বিকুলি করতে শুরু করে। সে এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে আর একটি সিগারেট ধরিয়ে ঘন ঘন টানতে থাকে। গ্রামে বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া ঘোরতর বেয়াদবী জেনেও রাশি রাশি ধোঁয়া উঠে জাহিদের মুখ থেকে যেন ইট ভাটার বিশাল বিশাল লম্বা চোঙ্গ থেকে সাদা সাদা ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ধোঁয়া নয় যেন পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষোভের গলিত বাষ্প। বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়াটাকে সে এখন আর বেয়াদবীও মনে করেনা। কিন্তু জাহিদ লক্ষ্য করে, অনেকেই তার দিকে যেন একটু কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে। জাহিদ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, শীতের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। গ্রামের লোকজন কানাঘুষা করে জাহিদ সেখানে বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে-সে নাকি আর মুসলমান নেই কম্যুনিষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ-খোদায় তার নাকি বিশ্বাস নেই। জাহিদের সবকথায় ওরা এখন কাফের কাফের গন্ধ পায়। জাহিদ কোন কথা বললেই অন্যকিছুর সন্দেহ করে গ্রামের লোকজন। জাহিদের কথায় যে যুক্তি থাকে সেগুলো যেন তাদের পাথরের চাইয়ের মত বিশ্বাসের উপর আঘাত করে। এইডা কেমন কতা, আল্লায় আমাগো না বানাইলে আমরা আইলাম কুনথিকা, আল্লায় খিলায় দেইকাইতো আমরা খাইতে পারি, বাইচা আছি, হেয় যহন ডাক দিবো তহন কি আর থাকনের উপায় আছে- হের কাছে চইল্যা যাইতে অইবো। চল্লিশটা হাতি দিয়া বাইন্ধা রাখলেই ফিরাইতে পারবো না। আল্লায় বলে নাই-এমুন কতা যে কয় তার উপরে আল্লার গজব নাইমা আহুক। দুই পাতা বই পইড়াই জজ ব্যারিষ্টার অইয়া গেছে গা না--, আল্লার উপর দিয়া কতা কইতে চায়, আল্লাই তো বেবাক কিছু বানাইছে, আর হে এতই যদি পারে তাইলে এডা পিরপা(পিঁপড়া) বানাইয়া দেহাইক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে জাহিদকে তারা মাঝে মঝেই মসজিদে নামাজের সময় সামনের কাতারে দেখতো পেতো। আর এখন হঠাৎ রাত্রিরে তারা দেখতে পায় কে একজন মাটির রাস্তা থেকে মসজিদের দিকে উঠে যাওয়া পাকা সিড়িতে বসে সিগারেট ফুকছে, জোরেশোরে একটা ধমক লাগাবে বা কষে একটা চড়- এমন ভাব নিয়ে কাছে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জাহিদের দুঃখ ভরা মুখ আবিষ্কার করে সেখান থেকে হতচিত্তে সরে আসে। জাহিদকে মাঝে মাঝেই বিষন্ন মুখে চরা ক্ষেতের আলধরে একা একা ঘুরতেও দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বলে তারা সবাই তাকে কিছুটা সমীহ করেও চলে। আর কেউ কেউ অবশ্য অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে জাহিদের কথা বলে গর্বও করে থাকে-আরে মিয়া চিনলা না, আমাগো গ্রামের জাহিদ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বিরাট বিদ্ধান ছেলে, মোটা মোটা বই পড়ে, কতকিছু যে জানে! আর এই বছর খানেক হল জাহিদের মাঝে নেতাগোছের একটা ভাবও তারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে। জাহিদকে এখন গ্রামের লোকজন আর বুঝতে পারেনা, এখন তাকে তাদের ভিন্ন গ্রহের মানুষ বলে বোধ হয়। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকা হাবাগোবা এই ছেলেটির আকস্মিক পরিবর্তনে তারা বিস্ময়ে বুঁদ হয়ে থাকে।

শামীমের মৃত্যু ঘটনাটা যেন জাহিদ চোখের সামনে দেখতে পায়। লোকজনের কাছ থেকে শুনে শুনে ঘটনাটি যেন তার মুখস্থ হয়ে গেছে। শামীম মালকোছা মেরে বাঁশের খুটি থেকে ঝুলে পড়া হাই ভোল্টেজের তারটি ঝিয়াই তার দিয়ে বেঁধে দিতে যাচ্ছে। হাই ভোল্টেজের তারটির উপর দিয়ে প্লাস্টিকের আবরণ থাকার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের গাফিলতির কারনেই তারের উপর দিয়ে প্লাস্টিকের আবরন মুড়ে দেয়া হয়নি। এই কারনেই সে মারা গেছে, না হলে সে মারা যেতো না। গ্রামের অশিক্ষিত লোকজনের কথা শুনলে তার পিত্তি জ্বলে যায়, ভিতরে ভিতরে সে রাগে ফেটে পড়ে। আজরাইল এসে নাকি তারের উপর ওঁত পেতে বসে ছিল, যেই শামীম তারে হাত দিয়েছে তখনই আজরাইল তার জান কবজ করে ফেলেছে; এটা কোন কথা হল! কারো নাকি কোন দোষ নেই। শামীমের মৃত্যু ওখানে ওভাবে লেখা ছিল-ওর মৃত্যু নাকি ওভাবেই হবে এটাই নাকি অবধারিত। হায়াত মউতের মালিক নাকি আল্লাহ!- সেখানে কারো কিচ্ছু করার নেই- “স্বপ্নেই নাকি জানান দিয়ে গেছে” এই কথাটা মুখে মুখে বলে বেড়ানো ছাড়া। ওরা যখন মুখে মুখে ছড়া কাটে “যার মৃত্যু যেখানে নাও ভাড়া কইরা যায় সেখানে”। তখন জাহিদের শরীর যেন রক্তশুন্য হয়ে যায়, গাঁয়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠে, চোখে ঘোলা অন্ধকার ঘনিয়ে আসে-যেন তক্ষুনি টাল খেয়ে পড়ে যাবে! যত সব গন্ড মূর্খের দল। এদের জন্যই পুরো দেশটা রসাতলে গেল। নিজেরা তো কিছু বুঝবেইনা আর বুঝদার কথা বলতে গেলেই উল্টো লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে। জাহিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে কবেই তাকে সবাই মিলে গ্রাম থেকে বের করে দিত! তার ভাবতে কষ্ট হয়, এদের সাথেই সে একগ্রামে হেসে খেলে বেড়ে উঠেছে। ওর কথা শুনে তারা বলে, তুমি তো আগে এরকম আছিলানা, হঠাৎ কইরা এমন বইদল্যা গেলা কেন? আগে কত বালা আছিলা, নামাজ পড়তা, রোজা রাকতা, মুরুব্বিগো আদব-কায়দা করতা-কলি যুগ আইয়া পড়ছে, ঘোর কলি। এরা কেউ পরিবর্তন সহ্য করতে পারেনা- কারো মাঝেই কোন পরিবর্তন দেখলে তারা ভয় পেয়ে নানা কিছু সন্দেহ করতে থাকে। যে কোন ধরনের পরিবর্তন এদের কাছে অস্বাভাবিক লাগে। সারা জীবন অপরিবর্তি থাকাটাই এদের কাছে স্বাভাবিক। সবকিছু যেন স্থির চিত্রের মত যেমন আছে ঠিক তেমনটিই থাকবে- যেন ক্যামেরায় তোলা ফটো। এই এদের সাথেই ওকে এখনও বসবাস করতে হয়! ভাবতে কষ্ট হয় জাহিদের। সেই সকাল থেকে গ্রামের লোকজনকে সে বোঝানোর চেষ্টা করে আসছে-তারের উপর প্লাষ্টিকের আবরণ না থাকার কারনেই ওর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কোন লাভ নেই-সে ওদেরকে কোনভাবেই বুঝাতে সক্ষম হচ্ছেনা। অথচ সে মনে মনে প্ল্যান করে রেখেছে, এই বিষয়টা নিয়ে সে গ্রামের মোটামুটি সবাইকে সাথে একটা জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলবে কিন্তু বয়স্কদের জন্য সে এগোতে পারছেনা। এই বয়স্করাই তার যেকোন কাজে প্রথম বাঁধা দেয়। গ্রামের তরুনরা যারা এখানে স্কুলে-কলেজে লেখা-পড়া করে তাদের অনেকেই তেমন কিছু না বুঝলেও অবশ্য তার দলেই থাকে সবসময়। কিন্তু তরুনরাও এখন সবাই শোকে কাতর হয়ে আছে। যে মরে গেছে সে তো মরেই গেছে কিন্তু আর কেউ যাতে মারা না যায় সেই ব্যবস্থা যে তাদেরকেই করতে হবে এই খেয়ালটুকু কেন যে তাদের মাথায় আসছেনা!

মামুন বিয়ে করেছে এই কিছুদিন হল- শামীম মারা যাবার দিন পনের আগে পাশের গ্রাম থেকে মাথায় মুকুট পড়ে, ম্যাছতা পড়া নাকটি রুমালে চেপে, সাতটি ট্যাম্পু ভাড়া করে পুতুলের মত দেখতে একটি মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। বরযাত্রীর একজন হিসেবে শামীমও গিয়েছিল সাথে, শামীমের সেদিন সে কি ফুর্তি- সারা শরীরে হাজার পাওয়ারের রঙ মেখে-সঙ সেজে হাসতে হাসতে ফিরেছিল বাড়িতে। পাশাপাশি বাড়ি ওদের- চরা ক্ষেতে ফুটবল খেলে, নদীতে সাতার কেটে, পচা ডোবায় একসাথে মাছ ধরে, বগলে বই খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে যেতে, মারামারি করে, গলাগলি ধরে একসাথেই বড় হয়েছে দুই জন-এবং শামীম বয়সে কিছুটা বড় হলেও তুই তোকারী সম্পর্ক ছিল দুইজনের সাথে। নতুন বিয়ে করা বউয়ের সাথে কম দামী বাল্বের লাল আলোতে দো-চালা ঘরে নড়বড়ে চৌকিতে বিভিন্ন জায়গা দিয়ে তুলো বের হতে থাকা লেপের নিচে শুয়ে এগুলোই ভাবতে থাকে মামুন। বাল্য বন্ধু শামীমের জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠে, বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হতে থাকে। সেই ছোট বেলা থেকে শুরু করে আজকে সকাল পর্যন্ত জমা হওয়া পুঞ্জীভূত স্মৃতিগুলো সিনেমার রুপালী পর্দায় ছবির আলো ফেলার মতোই মনের পর্দায় চলচ্চিত্রের মত একে একে ভেসে উঠতে থাকে। সারাদিনের খাটুনির পরে শরীরে-মনে কিছুটা ক্লান্তিও সে বোধ করে সে। আজকে শরীরের উপর দিয়ে তার অনেক ধকল গেছে- সেই চরা ক্ষেত থেকে শামীমকে উঠিয়ে নিয়ে এসে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া- নাকের ডগায় চশমা ঝুলানো ডাক্তার যাওয়ার সাথে সাথেই মৃত বলে ঘোষণা করলে লাশ নিয়ে গ্রামে ফিরে আসা, কবর খোড়া, বাঁশ কাটা ওদিকে আবার লাশের গোসল করানো, জানাজার জন্য মানুষ ডাকা-ওর বাড়ির লোকজন তো সব কেঁদে কেটেই অস্থির। সেও তো কেঁদে অস্থির হতে পারত ফলে কোন কাজই তাকে করতে হতনা! অবশেষে শামীমকে কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়েই কেবল মাত্র কিছুটা গা ঝাড়া দিতে পেরেছে। শামীম কবরে মাটি চাপা যাওয়ার সাথে সাথেই তার মনে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন ভঙ্গীতে গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে। শামীমের ভঙ্গী কখন ফুটবল খেলার- কখনো মারামারির- কখনো দৌড় ঝাপের- কখনো নদীতে লাফ ঝাপ সাতার কাটার- কখনো নদীতে-ডোবায়-পুকুরে মাছ মারার- বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার- মাঠে লাঙ্গল চষার-ধান কাটার- পেকা ক্ষেতে গোছা গারার। শামীমই ওকে সিগারেট খাওয়া শিখিয়েছিল। শামীমের সাথে নতুন নতুন সিগারেটে টান দেওয়ার স্মৃতি মনে হতেই তার শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে উঠে। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিয়াশলাইয়ের একখোঁচায় ধরিয়ে ফেলে ঘন ঘন টান দিতে থাকে। স্মৃতির রিলে ফিতায় সে সবশেষে দেখতে পায় শামীমের সাথে খারাপ মেয়েদের পাড়ায় যাওয়ার দৃশ্য। শামীমই তাকে ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ঐ দিনই সে নারী মাংশের স্বাদ প্রথমবারের মত পায়। হঠাৎ করে আধপোড়া সিগারেটটি হাত থেকে খসে পড়ে কড়কড়ে ঠান্ডা মাটির মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে থাকে। শক্ত তোষকের বিছানায় শরীর ঘষটে ঘষটে এগিয়ে যেতে থাকে বউয়ের দিকে। খালি হয়ে যাওয়া বুকে কি যেন সে পেতে চায়, কিসের অভাব যেন তার বুকে বাজতে থাকে দ্রিম দ্রিম করে। গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে বউকে ঝাপটিয়ে ধরে সে। পেন্সিলের মত সরু ঠোট নেড়ে কেবল কৈশোর কাটানো বউটি অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠে-আপনে কি মানুষ! জ্বলজ্যান্ত লোকটা কারেন্টে ধইরা মইরা গেল-কান্দিতে কান্দিতে আমার চোখ দুইটা ফুইল্যা গেছে। খালি কবরের কথা-কবরের আজাবের কথা মনে পড়তাছে। আর গজবের ফেরেস্তাগো আমি জানি চোখের সামনে দেকতে পাইতাছি। কোথায় একটু দোয়া দরুদ পরবো তা না, আইজকাও! সরেন আপনে-আপনে একটা অমানুষ, আমার শইল ধরবেন না, ছাড়েন কইতাছি, ছারেন অহনি। বউয়ের ভৎসনা পূর্ব রাগের মধুর বকুনির মত মনে হয় মামুনের। তার আজকের আচরনে যেন স্বামীর একঘেয়ে ক্লান্তি নেই আছে মাতাল প্রেমিকের উন্মাদনা। সে তার বউয়ের গলায় ঘাড়ে বুকে ক্ষ্যাপার মত মুখ ঘষতে থাকে। অপর পক্ষ থেকে আসা কঠিন বাঁধা মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে ভেঙ্গে যায়-পাট খড়ির উপর দিয়ে কেউ হেটে গেলে যেমন ভাঙ্গতে থাকে মড়মড় করে। কিছুক্ষনের মধ্যেই পুরুষ মাংশের গন্ধে কাতর হয়ে পড়ে বালিকাটি। ক্ষীণ স্বরে অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করতে করতে অভ্যর্থনা জানাতে থাকে। কম দামী বাল্বের সুইচটি বন্ধ করার কথাও তাদের কারুরই খেয়াল থাকেনা।

শামীমের বাল্যবন্ধু মামুন যখন বুকে প্রচন্ড শোক নিয়ে ইন্দ্রিয়ের দুর্দান্ত খেলায় মেতে উঠেছে তখন মেশিন ঘরে (চরা ক্ষেতে ইরি ধানে সেচ দেওয়ার কাজে মোটর চালিত গভীর নলকুপ ঘিরে গড়ে উঠা টিনের একচালা ঘর) তাস-জুয়ার আসর জমেছে। এবার শীত যেন বেশ ঝাকিয়ে পড়েছে-কারো গায়ে রোঁয়া ওঠা পুরনো সোয়েটার- কেউ গায়ে চাপিয়েছে ভারী জ্যাকেট, একজনের শীত লাগে একটু বেশী- পুরোনো ছেরা কাথাটা দিয়েই সে নিজেকে আগাগোড়া মুড়ে নিয়েছে, আরেক জন হালকা একটা চাদর গায়ে দিয়ে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে গিয়েছে-মনে হচ্ছে এই চারজনের বুক থেকে উঠে আসা শোকের ধোঁয়া যেন। প্রত্যেকে পা মুড়িয়ে বসে বেজার মুখে তাস পিটাচ্ছে- লুঙ্গীর টোনায় খুচরা টাকা দলামলা হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। এরা সবাই আজকে আস্তে আস্তে কথা বলছে- নিজেদেরকে পুরোমাত্রায় মেলে ধরতে পারছেনা- কোথায় যেন বাঁধছে, কি যেন তাদেরকে আটকে ধরেছে। খুচরা টাকার মত এদের ভেতরের মানুষগুলো বিভিন্ন দিক থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে সরবে বের হবে বলে কিন্তু পেরে উঠছেনা। একজন তাস বাটতে বাটতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললঃ গত কাইল রাইতে শামীম আমাগো লগে এইহানে বইস্যা তাস খেলতাছিল। আর আইজক্যা কই শুইয়া রইছে- আল্লাই জানে, আমাগোও যাইতে অইবো রে যাইতে অইবো, শামীম যেহানে গেছে। ছেড়াডা বালা মানুষ আছিলরে, খুব বালা মানুষ আছিল, এমুন মানুষ পাওয়া যায় না, বালা মানুষ বেশীদিন বাঁচে না! আরেকজন বেটে দেওয়া তাস হাতে নিতে নিতে অস্ফুট কন্ঠে বলেঃ -তয় একটু রগচটা আছিল, যহন তহন রাইগ্যা উঠতো, এই আর কি। কিছু বুঝতে চাইতোনা, গায়ের জোরে হগলকিছু করতে চাইতো, মনে অইতো ধাক্কা দিয়া পাহাড় ফালাইয়া দিবো। মাথাডারে কাজেই লাগাইতো চাইতো না-এজন্যেইতো ভর দুপুরে কারেন্টে ধইরা মইরা গেলো! কামলাগো নগে গেছে প্যাকা ক্ষেতে গোছা গাড়তে, যাইয়া দেহে বাঁশের খুটি থাইক্যা কারেন্টের তার ঝুইলা পড়ছে। বোদাই আর কারে কয়, খালি হাতে গেছে কারেন্টের তার বাঁশের খুটির সাথে বাইন্দা দিতে। কারেন্ট নাই তো কি- যে কোন সোম যে আইয়া পড়তে পারে এই খেয়ালও নাই। এইটুকু বুঝও নাই যে কারেন্ট গেতেই কতক্ষণ আর আইতেই কতক্ষন। যেই তারডা ধরছে অমনি তো কারেন্ট আইয়া পড়ছে। হয় ও ধরার কিছুক্ষণ আগেই আইছে ও টের পায়নাই, কি আর কমু অর কতা। আরেক জন তাস ছাড়তে ছাড়তে বলে-তাস খেলাও ভালো বুঝতো না শামীম। আমাগো লগে তাসের জুয়া খেইল্যা খালি ট্যাহা ক্ষতি দিত। ওর ট্যাহা লাভ কইরাইতো আমাগো সংসার চলতো-বউ পোলাপানরে দুই মুঠা খাওয়াইতে পারতাম। ঐ যে সাদেক যে বিদেশ গেলো শামীমের কাছ থিক্যা ট্যাহা লাভ কইরাইতো গেলো। আগে দেখতিনা সাদেক খালি শামীমের পিছন পিছন ঘুরতো আর সুযোগ পাইলেই অরে নিয়ে জুয়া খেলতে বইতো। এক বাপের এক পোলা আছাল যহন যা চাইতো ওর মায় অরে তাই দিত আর সোম সোম বাপের পকেট থিকাও চুরি করতো। মায়ের আদর পাইয়া লেহাপড়াডাও আর করা অইলো না। ট্যাহা আনত আর জুয়া খেইলা, মদ খাইয়া, ঘরে ডাগর বউ থাকতেও খারাপ পাড়ায় যাইয়া সব উড়াইয়া দিতো। তয় দিল দরিয়া আছিল- কত মাইনষেরে যে কত ট্যাহা কর্জ দিত তার কোন ঠিকানা নাই। যে ছেলেটা হালকা একটা চাদর গায়ে দিয়ে জুবুথুবু হয়ে বসেছিল সে একটু নড়েচড়ে উঠলো। হঠাৎ করে কি যেন তার মনে পড়ে গেল, সে তার পাশের জনকে একটু ধাক্কা দিয়ে বললঃ হোনই একটা কথা কই, কাউরে কইস না কিন্তু বলাডা জানি ঠিক না কিন্তু না বইলা ঠিক থাকতে পারতাছিনা, বুকের ভেতর খালি মোচড় পারতাছে। মাসেকখানি আগে আমিও শামীমের কাছ থিকা কিছু ট্যাহা কর্জ করছিলাম, কেউই অবশ্য জানেনা(ফিসফিস করে), পরশু দিনও আমারে জিগাইছিল ট্যাহার কতা, আমি কইছি- আর সপ্তা খানিক সবুর কর ঠিক দিয়া দিমু। এহন তো ও মইরাই গেছে, ট্যাহাডা মনে অয় আর দিতে অইবো না। অর ট্যাহার চিন্তায় রাইতে বালা ঘুম অইতো না। তগো বিশ্বাস কইরা কইলাম, কাউরেই কইসনা কিন্তু অর বাপ-মায় জানি না জানে। ওর বাপে যে লোক হুনলে চাইতেও পারে, না চাইব না মনে অয়। একটা পোলা আছাল হেই মইরা গেছে, তার কর্জ দেওয়া ট্যাহা চাইব না মনে অয়। দেক তোরা কিন্তু কইস না কাউরে, তগো খোদার দোহাই। কাঁথা গায়ে দেওয়া লোকটি খোঁচা মেরে বলে, আজকে মনে অয় তর বালা ঘুম অইবোরে।

লেপের তলায় কাচুমুচু হয়ে শুয়ে থাকা ফজলু মিয়ার কানে হালকা একটা পাখির পালকের মত ঢোকে- আসসালাতু—খাইরুম—মিনান-- নউম—আসসালাতু—খাইরুম—মিনান—নউম--। সে আড়মোড়া দিয়ে পাশ ফিরে অন্ধকারের মধ্যেই তার বউয়ের বলীরেখা আঁকা মুখ অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পায় যেন। বউয়ের থলথলে হয়ে যাওয়া শরীরে তার হাতের স্পর্শ লাগতেই বিবমিষা জাগে। অন্ধকারে হাতড়ে বেড সুইচে চাপ দিতেই সাদা ঝকঝকে আলোয় তার ঘর ভরে যায়। লেপের তলা থেকে কোনমতে নিজেকে টেনে উঠিয়ে খাটে বসে পায়ে স্যান্ডেল গলাতে গলাতে তার চোখ পড়ে হালকা নীল রঙের তরতাজা ফ্রীজটির উপর। ফ্রীজটি যেন নীল শাড়ির ঘোমটা টানা মুখে নতুন বউয়ের মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে কাছে গিয়ে ফ্রিজের গায়ে হাত বুলাতে থাকে পরম আদরে। ফুলশয্যার রাতের মত ফ্রীজটিকে তার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। ফ্রীজের পিছনদিক থেকে বের হয়ে আসা একটা শব্দের রেশ তার কানে মিষ্টি মধুর গানের কলি হয়ে প্রবেশ করে। আবেশে নতুন বউয়ের নরম হাত শক্ত মুঠিতে চেপে ধরার মত সে ফ্রীজের হাতলটি ধরে টান দিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলে। ফ্রীজে থরে থরে সাজানো কোরবানীর ঈদে জবাই করা লাল ষাড়টির মাংশ। মাংশ থেকে উঠে আসা বাষ্পীয় ধোঁয়া তাকে মেঘলোকের দেশে নিয়ে যায়। সাদা তুলোর মত মেঘগুলো যেন তার চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভেতরের স্তুপাকার মাংশগুলোকে নতুন বউয়ের ফুলে উঠা পেটে তার ঔরসজাত অভূমিষ্ঠ সন্তানের মতই মনে হয়। ত্রিশ বছর আগে বিয়ে করেছে সে- এত দিনেও সে তার বউয়ের পেটে কোন সন্তান রাখতে সমর্থ হয়নি। কয়েকবছর আগ পর্যন্তও তার আশা ছিল কিন্তু ডাক্তার যখন শেষবারের মত বলে দিল সমস্যা নাকি তারই, সে একশো একটা বিয়ে করলেও নাকি তার সন্তান হবেনা। বউয়ের সমস্যা থাকলে না হয় সে আরেকটা বিয়ে করে ফেলত কিন্তু এখন সে তো তার বউকে আরেকজনের কাছে পাঠাতে পারেনা! তারপর সে ফ্রীজের নিচের ঢাকনাটি খুলে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়- যাক এখানে তাহলে কিছুটা জায়গা খালি আছে। সে খুব ভেবে চিন্তেই বেশ বড় একটা ফ্রীজ কিনেছে, টাকা যদিও একটু বেশী লেগেছে! কত কাজেই তো লাগতে পারে- সে কথা কি আর আগে থেকে ভেবে রাখা যায়। যত বেশী জমিয়ে রাখা যায় ততই ভালো। আজকেও তো কিছু জমাতে হবে-রেখে রেখে খেতে হবে। নিয়ে আসা যায় একবারে অনেক কিছু কিন্তু একবারে তো আর সব খেয়ে শেষ করে ফেলা যায় না, খেতে হয় ধীরে ধীরে।

আজকে শামীমের মৃত্যুর তিনদিন হলো-শামীমের বাবা কিছুদিন পরে করতে চেয়েছিল অবশ্য। এই ফজলু মিয়াইতো(বুকটা ইঞ্চি দুয়েক ফুলে উঠে) তাকে তাড়া দিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে আজকের দিনটাই ঠিক করেছে। দেরী করে কী লাভ বল, করতে যখন হবেই তাড়াতাড়িই করে ফেলাই তো ভালো। মরার খরচের কাজটা করে ফেললেই তোমার ছেলে কবরে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। আর করবে যেহেতু বেশ বড় করেই করো না কেন; সারা গ্রামের লোকজন খাবে, তোমার আত্মীয়স্বজনও তো কম নয়, তাই না? পেট পুরে খেয়ে দেয়ে যেন সবাই প্রাণ খুলে তোমার মরা ছেলের রুহুর জন্য দোয়া করতে পারে, সেই ব্যাবস্থা করতে না পারলে আর খরচ করা কেন! আর গ্রামে তোমার মর্যাদার কথাও তো তোমাকেই ভাবতে হবে, অন্যে তো আর সেটা ভেবে দিয়ে যাবেনা। ছোট করে করলে এলাকার লোকজন কি ভাববে বলতো? সবকিছুই তো খেয়াল রাখতে হয়। তুমি তো আর যেই সেই মানুষ নও। কি বলছো, টাকায় টান পড়বে, আরে কি যে বলো তুমি, আমি থাকতে ও কথা একদম মুখে এনো না। দু-জোড়া বলদ আর দুইটা মোটা সোটা খাসি হলেই তো তোমার চলে যাবে, নাকি বল? টাকা তুমি দিও যখন পার, আসল টাকাটা তাড়াতাড়ি দিতে না পারলে শুধু মাসে মাসে কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে গেলেই চলবে। আরে সুদ বলছো কি, সুদ হবে কেনো, ছি-ছি-ছি কি যে বলো তুমি!সুদের কারবার আমি করিনা, মানুষের বিপদ দেখলে পাশে গিয়ে দাড়াই। সেও যাতে আমার পাশে থাকে সবসময়। আমি তোমার বিপদ দেখলাম আর মাসে মাসে আমার বিপদ হলে সেটা একটু দেখবে, এই আর কি। মাতব্বর মানুষ তোমাদের সেবাযত্ন করেই দিন কেটে যায়। তোমাদের মত গায়ে খেটে তো আর উপার্জন করতে পারিনা। আরে- না—না- কি যে বলো তুমি, তোমার মাথা দেখি একবারে গিয়েছে বেশী রাখবো কেনো, তোমার বিপদের সময়, অন্যদের কাছ থেকে যা রাখি তার চেয়ে কিছু কমই রাখবো- ও নিয়ে তুমি একদম চিন্তা করোনা। টাকা তো আমার ঘরেই পড়ে থাকতো তাই না! আর আয়োজনের জন্য যে লোকজন লাগবে সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা, হাসালে আমাকে বড়! আমার লোক সব থাকবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, আর আমিও থাকবো সেই সকাল বেলায় গরু জবাই থেকে একেবারে পাতা ফেলা পর্যন্ত। ওরা তো আর টাকা পয়সা চাইতে আসবেনা তোমার কাছে, আর তার দরকারও নেই। শুধু দাওয়াত শেষে যদি কিছু মাংশ দই বেশী হয় সেখান থেকে কিছু দিয়ে দিলেই চলবে। আর সেটা নিয়েও তোমাকে ভাবতে হবে না- বারা খোরা তো সব ওরাই করবে, ওদেরটা ওরাই ভালো বুঝে নেবে। ফজলু মিয়া বলতে বলতে হঠাৎ করে অন্যমনস্ক হয়ে বলে ফেলেছিল, জানো তো আমি একটা বেশ বড় একটা ফ্রীজ কিনে ফেলেছি, কোরবানীর মাংশ রাখার পরও ঢের জায়গা এখনো বাকী আছে।

পুরো গ্রাম উৎসবে মেতে উঠেছে। সবাই দল বেঁধে ছুটে আসছে শামীমদের বাড়ির দিকে, গ্রামের কারো বাড়িতেই আজ দুপুর বেলা হাড়ি চড়েনি। দাওয়াত বাড়ীর চারপাশে কুকুর গুলো বিরতিহীন ঘেউ ঘেউ করছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হাঠৎ হঠাৎ দু একটি মোটাতাজা কুকুরকে গরুর লম্বা লম্বা হাড় নিয়ে দৌড়ে যেতে দেখে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠে। হাড়জিরজিরে কিছু কুকুর ও বিড়ালকে ঘেঁষাঘেঁষি করে কলার পাতায় লোকজনের রেখে যাওয়া ছড়ানো ছিটানো কিছু ভাত, মাংশের ঝোল, ঘোল দই চেটে চেটে খেতে দেখে দুই একটি ছেলে ছোকরা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। সারা দিন না খেতে পাওয়া ছাগলগুলোর ভ্যা ভ্যা করে ডাকে- নাভীর নিচে গোজ দিয়ে শাড়ি পড়া সদ্য গজে উঠা তরুনীদের কান ঝালাপালা হয়। ওরা তো আর গরুর হাড় চিবিয়ে খেতে জানেনা, দু একটি ছাগল ঘুরে ঘুরে নীরস কলা পাতা চিবায়। কাকগুলো বাড়ীর উপরে উড়ে উড়ে পাকদিয়ে চলেছে, তাদের কা-কা শব্দ ভদ্রলোকদের বিরক্তির মাত্রা বাড়িয়ে চলে-ছোটলোকদের ভাত, তরকারী, ডাল চেয়ে চিল্লাচিল্লিতে এমনিতেই তারা যারপরনাই বিরক্ত। গরু মারার খবর পেয়ে কয়েকটি শকুনও এসে জুটেছে। সেই সকাল থেকে তারা বাড়ীর পাশেই চরাক্ষেতে চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে শুধু দু-একটির ডানা ঝাপটানির আওয়াজ পেয়ে গ্রামের মুরুব্বীরা মনে মনে ঘোরতর অমঙ্গলের আশংকা করতে থাকে।

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্ত

“বলাই” বাহুল্য


বিয়ের পনের বছর পরেও বাঁজা অপবাদ ঘুচল না সুরমার। উঠতে বসতে শাশুড়ীর খোঁটা আর যখন সহ্য হল না তখন স্বামী শ্রীনাথের হাতে পায়ে ধরে ওর বড় ননদ কাজলের যমজ ছেলে “কানাই-বলাই” এর মধ্যে থেকে বলাইকে দত্তক নিল সুরমা।

ঘরের মধ্যে শ্রীনাথের অবস্থাই ভাল, বড়লোক শ্বশুরের কল্যাণে প্রোমোটারি করে বেশ দুপয়সার মুখ দেখেছে, অতএব ওর সাথে সুসম্পর্ক রাখতে সবাই আগ্রহী। ছোট ননদ লতারও দুই ছেলে, সেও চেয়েছিল বৌদি যেন তার এক ছেলেকে দত্তক নেয়। কিন্তু শাশুড়ীর ইশারায় শিকে ছিঁড়ল কাজলের ভাগ্যে। সুরমার ছেলে পাওয়া নিয়ে কথা, কিন্তু দুই বোনে একটু মন কষাকষি হয়ে গেল ওর অজান্তেই।

ছেলে পেয়ে সুরমারা স্বামী-স্ত্রী খুশি হলেও, ব্যাপারটা ভাল ভাবে নিল না ছোট নন্দাই আদিনাথ। গ্রামের একমাত্র হাতুড়ে ডাক্তার আদিনাথ আবার এবাড়ির গৃহ-চিকিৎসকও বটে। ফলে ঘরের অনেক গোপন(গুহ্য) কথা ওর জানা। এদিকে শালাজ নন্দাইয়ের সম্পর্কটাও বড় মধুর, তাই ঠাট্টা-ইয়ার্কি চলেই। আদিনাথ একদিন কথায় কথায় জানাল সন্তানহীনতাটা সুরমার দোষ নয়, প্রয়োজনে ও প্রমাণও দিতে পারবে। আদিনাথ লোকটা বড় নাছোড়বান্দা, তাই খানিক ইতস্তত করলেও, নিজের সক্ষমতাটা জেনে নিতে প্রমান যাচাইয়ে রাজী হয়ে গেল সুরমা। তারপর, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সুরমার কোল আলো করে এল সিদ্ধিনাথ। সুরমার ঘরে এখন চাঁদের হাট ...

অন্য খবর??

“বলাই” বাহুল্য...

গল্পকথা - সায়ক চক্রবর্তী

চিহ্ন


বেঁচে থাকার সংজ্ঞা সম্পর্কে তখনও একটা সুস্পষ্ট ধারণা জন্মেনি। বয়স নিতান্তই কম হওয়ায় এইসব গুরুগম্ভীর বিষয় মাথায় ঢুকত ঠিকই কিন্তু স্থায়ী হত না। এভাবে এক একটা বসন্ত আসা যাওয়া করছিল নিজের মনে। আমাদের পাশের বাড়িতে এক নতুন ভাড়াটিয়া এলো। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই কি ছুঁই, ভদ্রলোকের নাম তরুণ রায়, ধাম কলকাতা কিন্তু এখানে এসেছেন একটা যে কাজে সে কাজের জন্য আমাদের এলাকা সত্যি যোগ্যতম। কাজটা হল লেখালেখি। আমাদের এলাকা নন্দন কানন না হলেও দু একজন দেবতুল্য মানুষ আসেন বটে বেড়াতে। প্রকৃতি যেন নিখুঁত করে সাজিয়েছে এই গ্রাম। আমি রক্তিম। আমি আপাতত বাবার হোটেলের ভাত ধ্বংস করে সেই শক্তিতে দু একটা কবিতা গপ্প লেখার চেষ্টা করছি দিনরাত আর তাই একটু আধটু বুঝি। তরুণ রায়ের লেখা যখন আমি পড়লাম তখন যেন হাতে স্বর্গ পেলাম। হাতের কাছেই গুরুদেব, বৃথা দৌড়ে কাজ কি? আমি প্রায় ওনার চ্যালা হয়ে গেলাম। এরকম দক্ষতা এবং সাহিত্যের উপর দখল আমি এর আগে কাউকে দেখিনি অথচ ভাগ্যের গায়ে শ্যাওলা পড়ে পিছলে গেছে খ্যাতি। নাম নেই একফোঁটা, কিন্তু এতে তার দুঃখও নেই। অনেকবার উনি চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানোর, কোথাও ছাপেনি। উল্টে কোন কোন জায়গা থেকে তো এমন উত্তর এসেছে যে আমি হলে পিণ্ডি চটকে ছেড়ে দিতাম সম্পাদকের। একদিন জিজ্ঞেস করলাম – ‘ আচ্ছা জেঠু, জীবনের উদ্দেশ্য কি?’ তিনি বললেন – ‘ জীবন মানে চিহ্ন’। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম ওনার মুখের দিকে। ভাসা ভাসা কিছু তরঙ্গ আমার মননকে ছুঁয়ে গেলো।সেদিন আর কোন কথা হয়নি। উনি একটা পত্রিকায় লেখা পাঠাবেন বলে একটা গল্প লিখছিলেন। আমি বলে উঠলাম – ‘আবার পাঠাবেন? এরা তো আপনার লেখার কদর বোঝে না!, উনি একটু লিখে ; বললেন – ‘একদিন বুঝবে - শেষদিন বুঝবে।‘ আমি আবার থ হয়ে গেলাম। আর বাক্যব্যায় না করে বাড়ী ফিরে এলাম। এভাবে দিনের পর দিন ওনার সান্নিধ্য পেয়ে তখন আমিও একটু পাতে দেবার মত লিখতে শুরু করেছি। অনেকগুলো বছর এভাবে কেটে গেছে যেমন যায়।

সেদিন খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমি সন্ধ্যায় জেঠুর বাড়ী গিয়ে দেখলাম – কলম চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আশেপাশের লোকজনদের খবর দিলাম। এরপর কয়েকমাস কেটে গেছে। হঠাৎ একটা জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম ওনার লেখা ছাপা হয়েছে। দেখে যে আনন্দটা পেলাম সেটা চোখের জলের সাথেই ধুয়ে চলে গেলো। কয়েক সপ্তাহ পর আবার একটা লেখা... এভাবে প্রায় দু তিন মাস পর এখানে ওখানে ওনার লেখা... আলোচনা... বাড়িতে বুদ্ধিজীবীদের ঢল... পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ... চলল ২ বছর আরও। এখন তরুণ রায় বাংলার অন্যতম এক খ্যাতনামা সাহিত্যিক। দুদিন আগে আমি অফিস থেকে এসে যথারীতি চা খাচ্ছি আর বই নিয়ে বসেছি। হঠাৎ মনে হল – ‘ আমি ওনাকে কি কম ভালবাসতাম নাকি শ্রদ্ধাভক্তি কম ছিল? তেমন তো অভাব বোধ করছি না! কারণটা কি!’। টেবিলে ওঁর লেখা বইয়ের স্তূপ দেখে উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি আজকাল অফিসে যাই না। আঁচড় কাটি সাদা পাতায় যদি একটা দাগ স্পষ্ট হয়ে। ইচ্ছে করে আমারও টেবিলে পড়ে থাকতে – উদাস অথচ উজ্জ্বল!

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

কাশীনাথ গুঁই

সুরভী


মধুমতীর বাঁকের ছোট গাঁয়ের চাষার ছেলে অনি।ওর বাবা পণ্ডিতমশায়ের ভাগচাষী।অনিকে পরের জমিতে ঘাম ঝরিয়ে তেভাগার অকাট মুখ্যু না হতে হয় এই ছিল তার আশা।তাই হাতে পায়ে ধরায় অনিকে ভর্তির ব্যবস্থা করেন পণ্ডিতমশায়।সে ছেলে যে আধপেটা খেয়ে মলাটহীন আধছেঁড়া বই ঘেঁটে ফিবছর ক্লাসে ফার্ট হবে কে জানতো সেকথা।

সুরভী পণ্ডিতমশায়ের বড় নাতনী। সে এখন ক্লাস এইট। ছোটবেলা থেকেই পাড়ার ভাল ছেলে অনির কাছে পড়ার সময় পড়া বুঝেছে এক্কাদোক্কার সাথী হয়েছে।পড়া শেষে সূয্যি পাটে বসার সময় মাঠের ধারে দিঘির পাড়ে বসে ঘাস চিবোতে চিবোতে সূয্যিটাকে দিগবলয়ে লুকোচুরি খেলতে দেখেছে।মধুমতীর বুকে নৌকা বাইচের উত্তেজনায় বুকে হাপর টানতে টানতে অনির পিঠে মুখ লুকিয়েছে।

অনির মাধ্যমিকের বছর সুরভী ক্লাস নাইনে উঠতেই তার বাবা তাকে নিয়ে গিয়ে কর্মস্থল কলকাতার এক ভাল স্কুলে ভর্তি করে দিল।পূজোর ছুটিতে এসে সুরভী অনির পরীক্ষায় লেখার জন্য পার্কার ফাউন্টেন পেনটা দিয়ে ওকে মনে রাখতে বলেছিল।ভাইফোঁটার বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে ঘটিম দিয়ে মুক্ত অক্ষরে নিজের নামটা মন্দিরের দেওয়ালে লিখে অনির কানে কানে কি যেন বলেছিল।

পরদিন সুরভী কলকাতা চলে যাওয়ার আগে অনিকে টানতে টানতে আবার মন্দিরে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ একটা প্রণাম করে হাত পেতেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠোঁটে একটা গরম ছ্যাঁকা টের পেয়ছিল অনি। ততক্ষণে সুরভী হরিণীর মত নাগালের বাইরে।শহরে যাওয়ার সময় খেয়াঘাটে ফের একবার সুরভীর চোখে কি যেন পড়ে নিল অনি।সেই রাতেই অনির রাতজাগার হাতেখড়ি হল।

মাধ্যমিকের ফল গাঁয়ের মুখ উজ্জ্বল করলেও অনি আরও ভাল করতেই পারতো।তবু জেলার দ্বিতীয় স্থানটা ওর দখলে রেখছে অনি। তাই নারাণঞ্জের স্কুলে ভর্তি হতেও অসুবিধে হল না।কিন্তু কোঁচরে মুড়ি বেঁধে রোজ যাতায়াতে ওর শরীরটা বেশ ভেঙ্গে পড়ল।মনটাও ওর সঙ্গে শত্রুতা করতে ছাড়ল না।খেয়াঘাটে যাতায়াতে মন্দিরটা এড়িয়ে যাওয়ার পথ ছিল না যে।রাতের আকাশে তারাদের ভীড়ে সেই হাতপাতা মুখটা ওর ক্লান্ত শরীরটাকেও ঘুমের ঘরে যেতে দিতে চাইত না।

উচ্চ মাধ্যমিকের ফল শহরের সেরাদের মাঝামাঝিতে নামাল অনিকে।ফল বেরোনোর দুদিন আগেই ওর বাবা সাংসারিক মায়া ত্যাগ করে অনির ভাগচাষীর ছেলের পরিচয়টার সাথে দুমুঠোর ব্যবস্থাটাও কেড়ে নিল।অগত্যা অনি রোজগারের আশায় কলকাতামুখো হচ্ছে শুনে পণ্ডিতমশায় ডেকে পাঠালেন ওকে।কলকাতা শহরের জীবনে কত কঠিন প্রতিযোগীতা ও নিদারুন পরিণতি সেকথা বুঝিয়ে অনিকে নিবৃত্ত করলেন পোড়খেকো মানুষটি।ওনার পরিচিত নারাণঞ্জের একটা মোটর গ্যারজে শিক্ষানবীশ হিসেবে কিছু রোজগারের বন্দোবস্তও করে দিলেন তিনি।নাহলে সুরভী আর তার বাবা এ ছেলে উপর দুর্বল হয়ে আরও পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দিলে বিপত্তি বাড়বে মোক্ষম। এ ছেলে যে একদিন জাতে উঠে তাঁর বংশে চুনকালি মাখাবে তা তিনি অনক আগে টের পেয়েই তো সুরভিকে কলকাতা ঠেলছিলেন।

মা আর বোনের দায় টানতে টানতেও অনি একদিন একটা গ্যরাজের সুযোগ্য মালিক হল বৈকি। বোনকে জেদ করে কলকাতাতেই সুপাত্রস্থ করলও সে।তখনই জানল যে সুরভি আর তার নেই।বোনের বিয়ের পর ওর মায়ের খুব শখ হয়েছিল বৌরান্না ভাত খাওয়ার।নানা অছিলায় অনির এড়িয়ে যাওয়াতে কারণ বুঝতেও দেরী হয়নি মায়ের।মেয়ের মেয়েকে আদর করতে করতেই এক বিকলে তার চোখে চির সন্ধ্যা নেমে এল।

বোনের আগ্রহে আর আপন মনের নিভৃত কোন বাসনার টানে অনি একদিন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের পাশে তার ছোট্ট গ্যারেজ খুলে বসল।গুরুমশাইকে কথা দিয়েছিল অনি কখনও দখিন কলকাতামুখো হবে না। সেকথাও রেখেছে সে।অল্প দিনেই সুনামও এল তার।এল না শুধু সে, যার প্রতিক্ষায় তার এই মন্দির পাশে কাজের ছুতোয় বসে থাকা।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

মৌ দাশগুপ্তা

মানিকজোড়

পলাশ আর মন্দার দুই বন্ধু, বড় ভাব দুজনের। এক্কেবারে মানিকজোড়। যদিও দুজনের চেহারা-পত্তর, স্বভাব-চরিতর, এমনকি পছন্দ-অপছন্দের অবধি কোন মিল নেই।যেমন পলাশ বলে, “ আমার বউ হবে দারুন সুন্দরী, একদম ফাটাফাটি, ধবধবে ফরসা, টানা টানা পটলচেরা চোখ,বেশ সুরেলা গলা হবে, গান টানও জানবে, বাপের মালকড়িও থাকবে, ঐ একদম শো কেস এ সাজানো ডল পুতুলটি যেন।“মন্দার বলে “ না বাবা আমার ঐ রকম ডল ফল চাইনে, আমার বউটা বেশ পড়াশুনো জানবে, নিজেই চাকরি বাকরি করে ঘরে টাকা পয়সা আনবে আর হেভী রাঁধবে।“

যথাসময়ে দুজনেই ছাদনা তলায় হাজির হোল। পলাশের বউ পলা অল্প বয়সেই বাবা মাকে হারিয়ে মামাবাড়ীতে খুব অনাদরে মানুষ। কালো, দোহারা চেহারা, অনেকটা মঙ্গোলীয় ধাঁচের বোঁচা বোঁচা মুখচোখ, তবে ভারতীয় সঞ্চার নিগমে ভালো পোস্টে চাকরী করে। গান শুনতে হয়তো ভালবাসে তবে গাইতে পারে না। খুব ছোটবেলায় একবার মেনিনজাইটিস হয়েছিল, সে যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলেও গলাটা চির জীবনের মত ফ্যাঁসফ্যাঁসে হয়ে গেছে। ঘরজামাই মন্দারের বউ মন্দাকিনী বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে।নাম যাই হোক, সামনে এলে তাকিয়ে থাকতে হয় এমন সুন্দরী তবে কিনা বড্ড সিনেমার পোকা।বিদ্যে ঐ ক্লাস এইট।তবে নাচ টাচ জানে, রাগপ্রধান ও গাইতে পারে।সিনেমায় নামার ইচ্ছা হয়তো ছিল কিন্তু বাবার আপত্তিতে নামা আর হয়নি। মন্দারের বদরাগী শ্বশুরমশাই স্বভাবে কৃপন মানুষ। লোকে বলে হাত দিয়ে নাকি জল গলেনা। এক ঐ মেয়ের বেলাতেই কিছুটা ছাড়,তা বলে জামাইয়ের বেলায় নয়। মন্দাকিনী মানুষটাও অসম্ভব মেজাজী,এক গ্লাস জল অবধি গড়িয়ে খেতে শেখে নি।ঐ বড়লোক বাপের আদুরে মেয়েরা যেমন হয় আরকি!

পলাশ আর মন্দার কেউ আর কারো বাড়ী যায়না এখন। রাস্তায় দেখা হলে অনেক কথা বললেও কেউ ভুল করেও বলে না ” আচ্ছা বউ নিয়ে আমার বাড়ী যাস, জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।বরঞ্চ সন্তর্পনে যে যার বউয়র প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়।কি দরকার বাবা খাল কেটে কুমীর আনার! পলাশ আর মন্দার দুজনেই তাদের বউদের বড় বাধ্য। এই এক ব্যাপারে দু বন্ধুর ভারী মিল। যেমন ঐ মানিকজোড়দের হয় আর কি।

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

মৌ দাশগুপ্তা

নীড় ছোট, ক্ষতি নেই

কবিবন্ধু নীল আর ওর বউ আঁখির একান্ত অনুরোধে অনেকদিন পরে শ্রাবনমাসের রবিবারের সকালটাকে চোখ মেলে দেখতে দেখতে চলেছি কলকাতা শহর ছাড়িয়ে শহরতলীর পথে। প্রবাসী চোখে যাচাই করছি কতটা পালটে গেছে আমার চিরচেনা শহরের পটভূমি!

নীল আর আঁখি দুজনেই আমার ছোটবেলার বন্ধু, একপাড়াতেই বড় হওয়া, স্কুল
থেকে কলেজে যাওয়া, বৈবাহিক সূ্ত্রে বাংলার বাইরে থাকলেও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বদাণ্যতায় যোগাযোগে ভাঁটা পড়েনি। নীলের খুব ছোটবেলাতেই বাবা মা মারা যাবার কারণে ও ওর ঠাকুরদার কাছেই বড় হয়েছে। রুদ্রদাদু আমাদেরও খুব আপনজন.আজ সেই রুদ্রদাদুর পারলৌকিক কাজ উপলক্ষ্যেই যাচ্ছি। যতটা না রুদ্রদাদুর টানে,তার থেকে অনেক বেশী নীল,আঁখির মত ছোটবেলার বন্ধুদের টানে,পিছে ফেলে আসা বাল্যকালের সেই গাছপালা,পুকুরঘাট,স্কুলবাড়ী,খেলার মাঠ,ঝোপ জঙ্গল,মেঠোপথ,রাস্তাঘাটের টানে। অবশ্য মিথ্যে বলব না, ঠিক এই সময়েই হঠাৎ করে কলকাতায় সপ্তাহখানেকের একটা অফিসিয়াল ট্যুর পেয়ে যাওয়ায় আসার তাগিদটাও জোরালো হয়েছে। তার জন্য অবশ্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি,তবে সে প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর। নীল ওদের বসতবাড়ীটা এক  সংস্থাকে
দান করে দিয়েছে, রুদ্রদাদুর কাজের দিনই ওখানে ওই  সংস্থা তাদের নতুন একটি বৃদ্ধাশ্রম শাখার উদ্বোধন করছে, “নীড়”। সে অনুষ্ঠান দেখার আগ্রহটাও ষোলোআনা আছে।।

যাবার পরে বুঝলাম, না আসলে সত্যিই অনেক কিছু মিস করতাম, অনেককে মিস
করতাম। আমার এখন আসা হয় কালেভদ্রে, কারো সাথেই সেভাবে দেখা সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনা, এবার একজায়গায় একসাথে অনেককে পেয়ে গেলাম। পুরানো বন্ধু, পুরানো পাড়ার মামা-মামী, কাকা কাকী, দাদা-বৌদি, দিদি-জাম্বুদের,অনেক নতুন মুখও দেখলাম। বেশ লাগছিল।

এক প্রাক্তন শিক্ষিকার সাথে দেখা হল, অবসরের পরে সমাজসেবা নিয়ে ব্যস্ত
আছেন শুনলাম। প্রনাম করে কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম - অবসর জীবন কেমন কাটছে ।
উত্তরে তিনি জানালেন-
- ভালই, তবে খুব ব্যস্ত।
- কি নিয়ে?
- এই নিন্দা জ্ঞাপন, শোকজ্ঞাপন ও অভিনন্দন জানানো নিয়ে
- মানে?
- কেউ খারাপ কিছু করলে তার জন্য নিন্দা জ্ঞাপন, কেউ মারা গেলে তার জন্য শোক জ্ঞাপন আর কেউ ভাল কিছু করলে তাকে অভিনন্দন জানানো।
- এতে আসলে কি হয়, বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু যদি বিষয়টা পরিস্কার করে বলতেন!!
- আমি যে এখনও আছি এটা জনগণকে জানানো মানে জনগনের সাথে ক্লোজ কন্ট্যাক্টে থাকা আর কি।
আর কথা বাড়ালাম না, বুঝলাম পরিবর্তন সব জায়গাতেই ছায়া ফেলছে। হঠাৎই মনে পড়ল আমাদের স্কুলের বড়দিদিমনির কথা, বিখ্যাত বিপ্লবী সতীশ সেনের ভাগ্নী, সেই সময়কার ট্রিপল এম.এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার গায়েত্রী সেনগুপ্তার কথা।বেঁচে থাকলে এই পরিবর্তন কি গায়েত্রী দিদিমনির ওপরও এভাবে ছায়া ফেলত?

বেশ কাটলো সারাদিন, সেদিন আর ফেরা হোল না, ঠিক করলাম পরদিন একটু ঘুরে
ফিরে এর -তার সাথে দেখা করার কাজটা সেরে নেব। আঁখি বললো সারাদিন সঙ্গ দেবে। সুবিধাই হোল। রাতে খেতে বসে নীলই প্রথম প্রসঙ্গটা তুললো। ও নীড়ের ট্রাস্টিবোর্ডের মেম্বার, নীড়ে দু’টো সীট আছে যে দু’টো স্পনসরশীপের ওপর চলে। অনেকেই আছেন যাঁরা এই সংস্থায় মাসিক আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকেন। আর্থিক সঙ্গতি আছে এমন চেনাশোনা সবার কাছেই খুব সামান্য অনুদান চাওয়া হয়। তারপরে কে দেবে আর কে দেবে না সে তাদের ব্যক্তিগত
সমস্যা। বললাম-
- আন্দাজ কি রকম দেয় লোকে?
মুখে ভাতের গ্রাস তুলতে গিয়ে হেসে ফেলে নীল বললো-
- তার কোন ঠিক আছে নাকি? ৫০ থেকে ৫০০, বেশী কম ও হয়, কতলোক তো দেব বলেও
দেয় না,কেউ এক দু’বার দিয়েই বন্ধ করে দেয়।ঠিক আছে নাকি?তোকেও জোর করছি না মিষ্টু, ইচ্ছা হলে দিবি, ইচ্ছা না হলে দিবি না, আর দিসই যদি কত দিবি সেটা তুই-ই ঠিক করবি, আমরা নাক গলাবো না।
আঁখি বললো-
- একটা কাজ করি মিষ্টু, আজ তো এখানে নীড়ের সবে উদ্বোধন হল, আবাসিকরা সবাই আসে নি। কাল চল তুই আর আমি বরঞ্চ ওদের নিমতা শাখাটা দেখে আসি। আগে কত ঘনঘন যেতাম, আজকাল নীলেরও সময় হয় না আর আমারও কলেজের ফাঁকে সময় পাই না। দাদুভাইয়ের অসুখটাও এমন সময়ে হল, দাদুভায়ের এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রথম ওখানে যাওয়া, এত ভালো লেগেছিল না রে মিষ্টু, রবিবার আসলেই মন টানতো। নিজের চোখে দেখার পরে নীড় সম্বন্ধে কিছুটা বেশী জানতে পারবি।

সাধু প্রস্তাব, কাল আমারও দারুন জরুরী কোন কাজ নেই, তো রাজী হয়ে
গেলাম। তা হলেও ঘুরে ফিরে কাজ মিটিয়ে নীড়ের নিমতা শাখায় পৌঁছতে পৌঁছাতে সন্ধ্যে হয়ে এল। দোষটা আমার নয়, আঁখি প্রায় মাস সাত আটেক পরে ওখানে যাচ্ছে বলে সবার নামে নামে খুটখাট ছোটমোট জিনিষ কেনাকাটি করেছে আর আমায় এ দোকান থেকে সে দোকান ঘুরিয়ে মেরেছে। আকাশ জুড়ে সেদিন জোৎস্নার ঢল নেমেছে, লোডশেডিং চলছিল বলে আরও ভালো লাগছিল জোৎস্নাটা। দেখতে দেখতে চাঁদ ছাপিয়ে উড়ে এল দামাল কালো মেঘ। চারপাশটা আরো অন্ধকার করে ঝেঁপে বৃষ্টি এল।

ছোট্ দোতলা বাড়ী, শান্ত পরিবেশ, অন্ধকারে বিশেষ কিছু আর দেখতে পেলাম
  না। ফিসঘরে একজন রোগা চেহারার হাসিমুখের ভদ্রমহিলা এমারজেন্সি লাইট জ্বেলে বসে ছিলেন। আঁখিকে যেভাবে সাদরে অভ্যর্থনা করলেন, বুঝলাম, ভালোই চেনেন। এটাসেটা দু এটা কথা বলে আঁখি বললো,
- ওঠ মিষ্টু, সবার সাথে দেখা করে আসি।
বলে ওর সারপ্রাইজ গিফ্টভরা ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা দিল, পিছন পিছন আমিও। ওর তালিকা থেকে একজন মারা গেছেন, দু’জন আপাতত হসপিটালাইজড, একজনকে প্রবাসী মেয়ে এসে বাড়ী নিয়ে গেছেন। তিনজনকে শারিরীক কারনে অন্য শাখায় পাঠানো হয়েছে। দু’জন নতুন এসেছেন। ঘুরতে ফিরতে হাসিদি (আসল নামটা জানি না) খবরগুলো দিলেন। দুজনের একজন রয়েছেন সেই স্পনসরড সীটে, খুব অসুস্থ, বিনাচিকিৎসায় কোন এক সরকারী হাসপাতালের বারান্দায় ধুঁকছিলেন, সহৃদয় কেউ এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। লম্বাটে একটেরে  ঘরে পরপর ছয়জনের থাকার ব্যাবস্থা। একদম দেওয়াল ঘেঁষে জানলার পাশের বেডটায় যিনি শুয়েছিলেন তাকে দেখিয়ে হাসিদি কথাগুলো বললেন। আমরা পাশে গিয়ে দাঁড়াতে খুব ক্ষীন কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন -
- যাও তো, জানালাটা খুলে মোমবাতিটা নিভিয়ে দাও। জ্যোৎস্না আসুক।”
- বড্ড বৃষ্টি বাইরে মাসীমা, আর মশাও ঢুকবে যে, -নরমভাবে হাসিদি বললেন।
-“জানালা দিয়ে এখন বৃষ্টি ভেঙ্গে নেমেছে লাগছে! সেটা আবার ঝপঝুপে শব্দের মাঝে! বড় অদ্ভুদ সে দৃশ্য। ভগবানের অমর সৃষ্টি, মানুষের আয়ূ আর কদিন? যা পারি দেখে নিই।”
সরে যাচ্ছিলাম, শুনতে পেলাম আপনমনে উনি বলছিলেন-
-“রোদের মাঝে যেমন বৃষ্টি নামে, তেমনি জ্যোৎস্নার মাঝে বৃষ্টি নামে নাকি? দেখতে খুব ইচ্ছা করছে। এক সাথে বৃষ্টি আর বাঁধভাঙ্গা জ্যোৎস্না....এ জীবনে আর দেখা হল না।”
“এক সাথে বৃষ্টি আর বাঁধভাঙ্গা জ্যোৎস্না.”???? বড্ড চেনা কথাগুলো, কোথায় যেন শুনেছি, ঠিক মনে পড়ছিল না, বাইরে সজোরে বিদুৎ চমকালো, লাইটগুলোও জ্বলে উঠল। আমরা দুজন একসাথে পিছিয়ে এসে ঝুঁকে পড়লাম ভদ্রমহিলাকে ভালো করে দেখতে।
- প্রভা দিদিমনি? এ কি চেহারা হয়েছে আপনার?
স্কুলে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা ছিলেন এই প্রভা দিদিমনি । আমাদের কি সুন্দর করে যে বাংলা পড়াতেন, কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর কি সরলভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বাড়ী গিয়ে আর মানেবই পড়র দরকার পড়ত না। অথচ মাধ্যমিকের ঠিক আগে কাউকে কিছু না বলে কেন যে আসা বন্ধ করে দিলেন জানিনা। পরে কানাঘুষোয় শুনেছিলাম পারিবারিক কারণে নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়ীর লোকে ওনাকে মানসিক রুগীদের হাসপাতালে ভরতি করিয়েছিল এবং উনি সম্ভবত ওখান থেকে কোথাও চলে গেছিলেন। অবিবাহিত প্রভা দিদিমনিকে আমরা সবাই খুব মনে করতাম। পরে সময়ের সাথে তিনিও ধূসর পান্ডুলিপিতে ছবি হয়ে ছিলেন। আজ সেই পান্ডুলিপির ধূসর পাতা খানিকটা ধূলো উড়িয়ে জানান দিলো, যে, আমি আছি।আমরা চিনলেও উনি কিন্তু আমাদের চিনতে পারলেন না। ওনার স্মৃতি, ওনার
বোধ, ওনার চিন্তা, পারিপার্শ্বিকতা আর কোনদিনই বর্তমানে ফিরবে না।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফেরত এলাম। আঁখিকে বললাম, দিদিমনির খরচাটা আমিই
  দেবো। অন্য কারো কাছ থেকে নেবার দরকার নেই। আমার পক্ষে তো আর থাকা সম্ভব নয়, আমার হয়ে আঁখিই যেন যা যা করনীয় সেটা করে আমায় খবর দেয়।

আমি গুরুদক্ষিণা দেবো ভাবলেই তো হল না, হয়ত গুরুদক্ষিণা দেবার যোগ্যতাও
সবার থাকে না।অন্তত আমার হয়তো নেই, ফেরার পথে রাস্তাতেই মোবাইলে আঁখির থেকে শেষখবরটা পেয়ে গেলাম।

এবার থেকে আমি জোৎস্নারাতে বৃষ্টি নামলেই জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার মাঝে
টিপটিপ বৃষ্টি নামা দেখবো। কারন আমি জানি ভরা জ্যোৎস্নায় কোনো অপূর্ণতা থাকে না।
 
 

রত্নদীপা দে ঘোষ


এক সন্ধ্যা

দুপুরের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আচমকা আওয়াজে। ঘুম এতো গভীর ছিল যে কিছুক্ষণ দেবারতি বুঝতে পারলেন না এখন সকাল না বিকেল। অতঃপর মন ফিরলো নিজ নিকেতনে। ঘড়ির দিকে চোখ। বিকেল চারটে বাবুই আর পিয়ালি অফিসে। নীচের তলায় সম্ববত নতুন ভাড়াটেরা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সকাল বেলাতেই ওদের মালপত্র এসে গিয়েছিল।

আসলে বাবুই আর পিয়ালি দুজনেই অ্যামেরিকা চলে যাচ্ছে। তাই নীচের তলাটা ভাড়া দেওয়া। বাবুই ঘ্যামা একটা জব পেয়েছে মেরিল্যান্ডে। এমনি ভাষা বাবুই পাখির। পিয়ালি এখনো কিছু পায়নি। তবে একবার সেখানে গিয়ে পড়তে পারলে পেতে কতক্ষণ। সমস্ত প্ল্যান বাবুই নিজেই ঠিক করেছে মায়ের জন্য, বাড়ীর জন্য নিজেদের জন্যতার একদম ইচ্ছে নয় যে তারা দুজনে চলে যাবার পর মা এই দোতলা বাড়ীতে একলা থাকুক। দেবারতি বহু পুরানো অ্যাস্থমা রুগী। তাছাড়া প্রেসার ও হাই এর দিকেবাবুই নিজেই ওল্ড হোমের আইডিয়াটা দিলো। এসব গত তিন মাস আগেকার ঘটনা। বাবুইরা নিজেরা দুজনে অনেক ওল্ড হোম ঘুরেছে কথা বার্তা বলেছে অবশেষে গোটা তিন চার ফাইনাল করে মায়ের দরজায় হানা। মায়ের থাকবার জায়গা মায়ের পছন্দ মতই হবে।

একটা রোববার দেখে তিনজনে বেরলেন। প্রথমটার নাম আশালতা। বেশ বড়ো, তিনতলা, একটু প্রাচীন গন্ধ। এই গন্ধটাই দেবারতির পছন্দ হোলো নানিজেকে পুরনো মানুষ ভাবতে তিনি রাজি হলেন না। নাম্বার টুটা জাস্ট ফাটাফাটি । বাবুইর মতে । পিয়ালির ভাল লাগ্ল ঘরের লাগোয়া ব্যালকণিটা । একদম এইটুকু । আর ঘরটার রঙ হাল্কা নীল । দেবারতির মনে হোলো ঠিক এই রকম একটা নীল রঙ কোথায় যেন ...একটু শীত , শালটা টেনে নিলেন গায়ে । দেবারতি এই বৃদ্ধাবাসটি পছন্দ করলেন

নীচের তলায় আসবাবপত্র টানাটানির আওয়াজ হচ্ছে , কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে । বসবার ঘরে টিভিটা অন করে এক কাপ চা । রোজগেরে গিন্নী প্রোগ্রামটা এই সময় প্রতিদিন দেখেন দেবারতি । একটু পরেই রান্নার ছেলেটি আসবে । আজ বাবুইরা পার্টি তে যাবে , রাত হবে ফিরতে ওদের । সবে নতুন গিন্নীর সাথে আলাপ হোলো কি হোলো না বেল বাজলো । দরজা খুলে দেখলেন বাচ্চা একটি মেয়ে এই বছর পাঁচ বয়েস আর সম্ভবত সাথে ওর মা । তার বয়েস মনে হয় পিয়ালির মতই ।
নমস্কার , আমরাই নীচের তলায় এসেছি । আমার নাম মল্লিকা আর এ আমার কন্যা ধানসিঁড়ি । আপাতত আমরা তিনজন থাকবো , দিন কুড়ির মধ্যে আমার বাবাও এসে যাবেন । চার জনের সংসার আমাদের , আমরা দু বোন , বাবা কখনো দিদির বাড়ী কখনো আমাদের সাথে থাকেন দেবারতি বাচ্চাটার গাল টিপে দিলেন । মা মেয়ে দুজনেই খুব বকবকে । কি মিষ্টি মেয়ে তোমার আর নামটাও ভারি সুন্দর রেখেছ... তোমরা যখন বাড়ী দেখতে এসেছিলে তখন আমি হরিদ্বারে ছিলুম বোনের বাড়ীতে , তাই দ্যাখা হয়নি আগে ।
হুম। মল্লিকা বললো , তাই তো আলাপ করতে এলুম । আপনিও তো চলে যাচ্ছেন ... হু, যাচ্ছি বৃদ্ধাবাসে । দেবারতি হাস্লেন , আসলে আমার ছেলে পছন্দ করছে না আমি বাড়ীতে একলা থাকি , আমি অনেক বোঝালুম যে নীচেও তো লোকজন থাকছে ... কিন্তু ছেলে রাজী হোলো না , আসলে আমার শরীরটাও ভালো যায়না তেমন ... বৃদ্ধাবাসে অনেকের মাঝখানে থাকা , কথাবার্তা আড্ডা এগুলো জরুরি তাছাড়া নিয়মিত ডাক্তারের চেক আপের ব্যবস্থাও আছে সেখানে ......ছেলে মেয়ে বড়ো হয়ে গেলে তাদের কথা শুনেই চলতে হয় ।
মল্লিকা বললো , কিন্তু থাকলে ভালো লাগতো আমাদেরও , দেবাশিস তো বেশীর ভাগ সময় ট্যুরেই থাকে , আমি বাবা আর মেয়ে । সুধাংশুর ছবিতে চোখ আটকেছে মল্লিকার । দেবারতি কবে ছেড়ে এসেছেন পঁয়তাল্লিশ । কিন্তু মেহগিনি ফটোফ্রেমে সুধাংশু এখনও চল্লিশ , ঝকঝকে যুবক । চশমার ফ্রেম আঁচলে মুছলেন দেবারতি , তোমার মেশোমশাই , আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহু বছর ।
মল্লিকাও বিষণ্ণ হোলো , আমার মাও অনেকদিন চলে গেছেন । আমার বাবাকে আপনি চিনলেও চিনতে পারেন । বাবা নতুন চাকরি পেয়ে যখন কলকাতায় আসেন তখন এ পাড়াতেই কোথাও ভাড়া থাকতেন । আমরা এখানে আসছি শুনেই বাবা খুব খুশি , বললেন সেকিরে , আমারি পুরনো পাড়া ...
আজ আসি মাসীমা ... পরে আবার আসবো । দেবারতি বললেন , এসো আবার বরকে , বাবাকেও নিয়ে এসো ... তোমার বাবার নাম কি ? নিখিল প্রামানিক ... মল্লিকার মেয়ে ছুটছে ... মল্লিকাও

একতলার ঘরের রঙ তখন ছিলো নীল । আজকেই সুধাংশুর রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন কি ভাগ্যিস সুধাংশুর অপেক্ষা না করে দেবারতি একলাই গিয়েছেন রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে । চেম্বারে বসে কাঁপছেন দেবারতি ... চোখের দিকে তাকিয়ে ডঃ সেন বলছেন , আপনারা অন্য কিছু ভাবুন না ... অ্যাডপ্ট করতে পারেন ... বা অন্য কিছু ... রাতে সুধাংশুর বুকে হাত রাখলেন দেবারতি । থ্যাঙ্ক গড , আমরা দুজনেই একদম নর্মাল ... আমার মন বলছে ... দেখো হয়তো সামনের মাসেই ...

পরের মাসে সুধাংশু তখন ট্যুরে । রাত নটা নাগাদ একতলায় । কলিং বেলে হাত রাখলেন দেবারতি । ঘরময় নীল , ব্যাচেলারস ডেন । অগোছালো শার্ট প্যান্ট আন্ডার গারমেন্ট ছড়ানো বিছানায় ... দেবারতি হাত রাখলেন নিখিলের ডেনিমে ... আঃ এতো নীল কেনো ...

বাবুইপাখি অবশ্য খুব ফর্সা , নীল শিরাগুলো উঁকি দ্যায় কখনো চামড়ার ফাঁক দিয়ে ।লোকে বলে ছেলে নাকি সুধাংশুর রঙ পেয়েছে আর নাক চোখ দেবারতির ।

বৃদ্ধাবাসে যাবার বেশী দিন বাকি নেই । টুকটাক জিনিসপত্র এরই মধ্যে গুছিয়ে ফেলেছিলেন দেবারতি , পছন্দের শাড়ি , গল্পের বই , অতুলপ্রসাদের সিডি ... নিজের বিয়ের একটা ছবি , বাবুই আর পিয়ালিরও
খুব দ্রুত দেবারতি জায়গার জিনিস সব জায়গামত গুছিয়ে রাখলেন ... বই, শাড়ি সিঁদুরদানের ফটোটাও বেরোলো অ্যামেরিকান ট্যুরিস্টার থেকে ... আঁচলে ছবিটা একবার মুছে শোবার ঘরের ছোট টিভির মাথায় রেখে দিলেন যেন আর কোত্থাও আর যাবার নেই তার ।

ছোট থেকেই সব্বাই জানে দেবারতি খুব গোছানো স্বভাবের মানুষ ।

ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৩

ছোটগল্প - নরেশ মণ্ডল

মুখোমুখি
নরেশ মণ্ডল



অনেক্ষণ বসেছিলম মুখোমুখি। কোনো কথা নেই। পরস্পর কেমন যেন চুপ মেরে আছি।

কেন ? ঠিক বুঝতে পারছি না। আছি এটা অনুভব করতে পারছি। একটা নীরবতা গ্রাস করে নিচ্ছে আমকে।জানি না অন্যজন কেমন আছে। কারণ আমরা কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারি না। শত চেষ্টা শর্তেও।কোনো শব্দও শুনতে পাই না। অনুভব করতে পারি আছি। মন উজার হওয়া কথাগুলো ভাসতে থাকে চোখের সামনে। পাহাড় ধোয়া জলও ছোঁয়া যায়। অথচ শব্দগুলো কেমন ভেসে যাচ্ছে সাবলীল ভাবে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাকে দেখতে পাচ্ছি। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কখনও আনমনা ভাবে পাশ পাশ ফিরে অন্যদিকে চেয়ে আছে। সে যেভাবে দেখাবে আমাকে তাই দেখতে হবে। আমার মতো করে আমি তাকে দেখতে পাবো না। তাকে হাসবার কথা জানাতে পারি। সে হেসে কুটিকুটি হতে পারে। আমিও হাসতে পারি।ভীষণ জোরে গলা ফাটিয়ে। পাশের বাড়ির প্রতিবেশি ফোন করতে পারেন। সুস্থ আছি কিনা জানতে আগ্রহী হতে পারেন। নীলা বৌদির মিষ্টি রিনিঝিনি গলা কানির কাছে বেজে উঠতে পারে। কি ব‌্যাপার এত এত রাতে! গলা আরো আরো মোলায়াম হপে পারে। গাঢ় স্বর পাশের ফ্ল‌্যাট থেকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমি ভাসছি মেঘের ভেলায়। সে কোন নদীর ধারে। কিংবা নির্জন রাস্তার ধারে উঁচু দক্ষিণ খোলা

কোণে। হুস করে দ্রুতগামী কোনো গাড়ি পার হয়। কোনো অজানা পাখি ডেকে যায় উড়ে।

মারুফার বিস্ময়ে হাসে। কপালের টিপটা আলগা হয়নি এখনো । কপালের চুলগুলো দুষ্টু বাতাসে এলোমেলো করে যায়। বাঁ হাত কপাল ছুঁয়ে ঠিক করে নিতে চায়। শব্দকে বহ্ম বলে। আমি ঠিক জানি না। ছোটো খাটো শব্দগুলো ফুল হয়ে ভাসে। হাসনুহানা, গোলাপ, কামিনী', জুঁই মারুফার ছুঁয়ে আছে। কত শত মালা গাঁথা হয়।প্রতিদিন। জীবনযাপনের টুং টাং ভেঙে পড়া বোধ রুচি জমা হয় রিসাইকেলবিনে। ঘেঁটে দেখার সময় বড় কম। জমতে থাকা ঝুড়িটা একদিন কেউ না কেউ সাফ করে দেয়। ফিরে দেখে ক’জন! আমার ফুলের সুবাস নিলে না তুমি। আসলে তুমি নিতে পারো কিনা সেটাই জানা হয়ে ওঠে না। তোমার ফুলের সুবাসও আমি নিতে পারিনি। কোনো না কোনো কারণে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। হাত ধরে হাঁটি। আইসক্রিমে গাল ভরিয়ে পেসট্রিটে কামড়। কিছু একটা করব বলে টলটলে পায়ে ফিলটারেই ধরায় আগুন।

শূন্যটা গ্রাস করে আছে। আমাদের একত্র জীবনযাপনের ফাঁক গলে আমরাই কখন হয়ে উঠি অন্য মানুষ।আমাদের ছোটোকাল, উনিশ-কুড়ি জানা হয় না। জানতে চাই না বা জানাই না।

গোপনতা জমে থাকে নিজস্ব গোপন কুঠুরিতে। কালাধারে। কিছুটা অচেনাই থেকে যাই। বের হলে কখনও বিপন্নতা। সেখানেই মুখোমুখি। অন্য কোনো মুখ আর এক মুখের কাছে আসে। জানি না। অচেনা চেনা হয় দূর থেকেই। না জানা বাড়তে থাকে। তখনই....

-ভালো আছো?

-তুমি?

-ভালো। তোমার কবিতার অনুষ্ঠানটা কেমন হলো।

-বেশ ভালো হয়েছে। অনেকেই বেশ খুশি । কেউ কেউ এসে অভিনন্দন জানিয়ে গেল।

-তাহলে খুব ভালো হয়েছে বলো। তুমিতো খুব চিন্তায় ছিলে। বলে ছিলাম না মনে জোর আনো। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি এখান থেকে তোমাকে আর কতটা সাহায্য করতে পারি। কিছু বইয়ের খবর দিতে পারি। কিন্তু জোগাড় তোমাকেই করতে হয়েছে। আমি এক প্রান্তে আর তুমি কোথায়। অন্য দেশে। তবু আমরা কত কাছে। মনে হয় তোমার নিঃশ্বাসের শব্দও আমি পাই। কোন ফুলের অভিনন্দন নেবে তুমি। তোমার ঘরের রঙ জানি না। কোন ফুলে সাজানো ঘর। তোমার পরিবারপরিজন কিছুই জানি না আমি। তুমিও জানো না। কখনো কারো ছবি দেখোছো। যেমন আমিও। এখানেই মুখোমুখি চেনা। বসে থাকা। তির তির করে বয়ে যায় শব্দ। একটা ক‌্যানভাস ক্রমশ রঙিন থেকে রঙিন হয়।

তুলির টানে গড়েওঠে অবয়ব। কুলকুলে নদী এক পার ভেঙে গড়েতোলে নিজস্ব ভূমি। সেই

অন্যভূবনে দুজন মুখোমুখি ছাড়া নেই অন্য কোনো মানুষ। পাখা মেলে অন্য জগৎ। নিজস্ব গোপনতা ভাঙে।মনের শূন্যতা ক‌্যানভাস ভরায় রঙের গভীরতায়। রাত গভীর হয় মুখোমুখি তুলি হাতে আমরা দুজন।তোমার পিছনে নেই অন্য চোখ। আমারও। দেশের গণ্ডী ছেড়ে অন্যখানে আর এক মানুষ। প্রজাপতি মেলে রঙ। চেনা জন দেখে না মেলে চোখ।

হালকা নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থাকো ব‌্যালকনিতে। আমি তোমায় ঠিক দেখে নেব। তোমার ছড়ানো চুলের জুঁই গন্ধ ঠিক পেয়ে গেছি আমি। মারুফার চাঁদের আলো তোমাকে ছুঁয়ে যাবে।

আমার আগে কেউ তোমাকে ছুঁয়ে যাক চাই না আমি।


এবার পি সি-র আলো নিভে যাক। কাল আবার। এই পৃথিবীটা আমাদেরই থাক।

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৩

ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্তা



অথ অহি – নকুল কথা


অহিভূষণ ঘোষ আর নকুলচরন বোস,ছেলেবেলার  বন্ধু। সুজনেরা বলে “মানিকজোড়। সম্প্রতি অহিভূষণের ছেলে অজয়ের সাথে নকুলচরনের মেয়ে নম্রতার বিয়ের কথা চলছে।

অজয় চশমা পড়া পড়ুয়া মানুষ, আর নম্রতা ? সারাদিন বকমবকম কথা, খিলখিলে হাসি। বইপোকা অজয় অনেক ভেবেচিন্তে, বন্ধু বান্ধবের সাথে শলা পরামর্শ করে, যেই না একদিন নম্রতাকে বলেছে
-“আমি তোকে খুব ভালোবাসি নমি, আমায় বিয়ে করবি?”,
অমনি নম্রতা হাসতে হাসতে উল্টে পড়ে আর কি,টানা আধ ঘন্টা খিলিলিয়ে গা জ্বালানো হাসির পর নম্রতা জানালো সে রাজি, তবে একটা শর্ত আছে।অজয় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।একটা মোটে শর্ত তো? অত মিষ্টি মেয়ের এইটুকু দাবী তো মানাই যায়

এরপর আর কি!! ওরা চুটিয়ে প্রেম করল দু’বছর। অবশেষে একদিন অহিভূষণ বাবু ছেলেকে ডেকে পাঠিয়ে, গলা টলা ঝেড়ে কপট গম্ভীর গলায় বললেন,_'দেখো বাপু, অনেক হয়েছে। পাড়ার লোকে বড় কানাকনি করছে। এবার আমি তোমাদের বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই, তুমি কি বলো?

অজয়ও দৌড়ালো তার নমিকে এই হাতে গরম সুখবরটি দিতে। খবরটা শুনে নমি কিছুক্ষন ভাবলো বলবে কি বলবে না, অথবা কি বলবে সেটাই বোধহয় মনে মনে ভেবে নিলো। তারপর মুখ তুলে বলল
-আমি বিয়ের পরে বাবা মাকে ছেড়ে পাকাপাকিভাবে অন্যকোথাও শ্বশুরবাড়ীর কনে বউটি সেজে থাকতে পারবো না, বাবা মাকে বুড়ো বয়সে দেখবে কে? আমার তো অন্য ভাইবোন নেই। তুমি বাড়ীতে কথাটা বুঝিয়ে বোলো। আর হ্যাঁ, এটাই ছিলো আমার শর্ত,তুমি না শুনেই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলে।

আচমকা নম্রতার এ হেন শর্ত অজয়কে রীতিমত চিন্তায়ফেললো। আক্ষরিক ভাবে এখন ওর দশা, শ্যাম (উপসসস্, রাধা) রাখি না কূল? ।তারপর আর কি! নম্রতার শর্ত মেনে দু’বাড়ীর গিন্নীদের আর নকুলবাবুর ঐকান্তিক আগ্রহ ও সম্মতিতে এবং অহিবাবুর চুড়ান্ত বিরোধিতা ও অসম্মতিতে বিয়েটা হয়ে গেল বটে তবে কিনা অহিভূষণ ঘোষ আর নকুলচরন বোসের,ছেলেবেলার বন্ধুত্বটা এখন আক্ষরিক অহি-নকুল সম্পর্ক হয়েই দাঁড়িয়েছে।

ছোটগল্প - মেহেদী হাসান

উৎসব



শীতের বিষণ্ণ দুপুর- ভরপেট খেয়ে আরামের ঘুম দিয়েছে রাসেল। গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সমস্ত শরীর একটা পুরু কম্বলে ঢাকা। দরজা-জানালা সব এঁটে বন্ধ করে দেয়া-পুরো ঘর জুড়ে যেন কবরের ঘন নিস্তব্ধতা। রাসেল ঘুমের অতলে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সুখ স্বপ্নে, স্বপ্ন প্রাঙ্গনের এক কোনায় হঠাৎ সে দেখতে পেল দুইজন লোক নিজেদের ভেতর কি একটা রহস্যজনক বিষয় নিয়ে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। তাদের এই ফিসফিস শব্দ শুনে কোথা থেকে যেন আরেকজন লোক এসে যোগ দিল। ফিসফিসানির শব্দ ধীরে ধীরে গুঞ্জনে পরিণত হতে থাকে। তারপর দুই দিক থেকে দুইজন, এপাশ থেকে তিনজন, ওপাশ থেকে আরো চারজন- এভাবে আস্তে আস্তে চতুর্দিক থেকে অনেক মানুষ এসে জড়ো হতে লাগল। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের মত গর্জন করতে করতে দল বেঁধে আসছে সবাই। গুঞ্জন বাড়তে বাড়তে কোলাহলে পরিনত হয়ে স্বপ্নের ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করে বৃহৎ বাস্তবের উঠানে এসে পড়ল।

রাসেলের মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ভাব, আড়ষ্ট চোখের পাতা খুলতে কষ্ট হচ্ছে; শরীরটা যেন এখনও শুয়ে আছে ঘুমের বিছানাতেই। চতুর্দিক থেকে তীব্র কোলাহল, বিকট চিৎকার, ছোঁয়াচে চেঁচামেচি, হল্লা দিয়ে কান্না, বুক থাপড়ানো হাহাকার, অস্ফুট ধ্বনি, অস্পষ্ট বিভিন্ন ধরনের শব্দ তার কানের পর্দায় ঠাস ঠাস করে আঘাত করছে!

উঠান ভর্তি দিকভ্রান্ত মানুষ পাগলের মত এদিক সেদিক ছুটছে। প্রায় সবারই হাতে-পায়ে, মুখে, মাথার চুলে- শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পিচ্ছিল কাদা। অধিকাংশ পুরুষের লুঙ্গি মালকোছা মারা, মহিলাদের শাড়ীর আঁচল ঘাড়-বুক থেকে খসে গেছে অনেক আগেই, যাদের পরনে ব্লাউজ নেই, আথালি-পাথালি হাঁটাচলা ও দৌড়-ঝাপের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের ঝুলে পড়া স্তন জোড়ার লাফঝাঁপ দেখে অনেক ভদ্র লোকেরই বিবমিষা উদ্রেক করবে। ছিমছাম কয়েকটি ছাত্র ছোকরা জনতার দঙ্গল থেকে সাবধানে গা বাঁচিয়ে উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। গ্রামের মুরুব্বীদের অবাক চোখে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে করতে মাথার চুল ধরে টানার দৃশ্য দেখেও বোঝার উপায় নেই ঘটনাটা আসলে কি! কিশোরী মেয়েদের চুলের খোপা খসে গিয়ে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত এ ঘাড় থেকে ও ঘাড় পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ানোর সৌন্দর্য এরকম সময়েও অনেকেই মোহিত করবে বলেই মনে হয়। উঠানের সামনের দিক দিয়ে অবিরত ভাবে লোকজন বের হয়ে যেতে থাকলেও উঠানে কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না কারন চরাক্ষেত থেকে পুকুরের ধার দিয়ে দীর্ঘ মিছিলের লেজের মত লোকজন হাঁপাতে হাঁপাতে উঠোনে এসে যেন অনেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

রাসেল যাকে হাতের কাছে পেল তাকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল, কি অইছে আপনারা এমন করতাছেন ক্যা? দোহাই লাগে ঘটনাটা খুইলা কইন। আপনেগো ব্যাপার স্যাপার আমি কিছুই বুঝতাছিনা। আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে, আমারে কইন কি অইছে, দেহি কি করন যায়; দয়া কইরা শান্ত অইন। অস্থির অইন না জানি, আমার ঘরে আইয়া বইয়া কইন ঘটনা কি অইছে। ঘটনাটা খুলে বলা তো দূরের কথা রাসেলের দিকে কেউ একটি বারের জন্য ভ্রুক্ষেপও করলনা। তার আত্মসন্মান বড় ধরনের একটি ঘা খেল, অহংকার মূর্ছিত হয়ে রইল কিছুক্ষণের জন্য। সে ক্রুদ্ধ হয়ে সামনের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো। ফুলে উঠা রাগ কোন দিক দিয়ে বের হবার সুযোগ না পেয়ে বুকের ভেতর গজগজ করতে থাকে।

কটি বয়স্কা নারী, হাঁপাতে হাঁপাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলল, এডা লুঙ্গি দেও বাবা; তাড়াতাড়ি এডা লুঙ্গি ঘর থিক্যা বাইর কইরা আনো। অর লুঙ্গির মধ্যে ক্যাদা নাইগা বোঝাই অইয়া গেছে গা। মহিলাটি রাসেলের দুঃসম্পর্কীয় আপা লাগলেও নির্দিদ্ধায় তাকে বাবা সম্বোধন করতে একটুও আটকালনা। এ রকম কোলাহলের মধ্যে কাউকে কোনকিছু দিলে তা ফেরত পাওয়ার আশা করা বোকামী। ঘরে তো কোন লুঙ্গি নাই, লুঙ্গি দিয়া কি অইব? আইচ্ছা ঘটনাটা কি অইছে আমারে খুইলা কইনছে। মহিলাটি শুধু বলতে পারলো, আমাগো শামীমেরে কারেন্টে ধরছে গো---কারেন্টে ধরছে। মরতাছে গো মরতাছে—কারেন্টে ধইরা মরতাছে! মহিলাটি আবার হাঁপাতে হাঁপাতে জনস্রোতের সাথে মিশে গিয়ে পাগলের মত দু হাত দিয়ে মানুষজন সরাতে সরাতে সামনের দিকে এগুতে লাগলো। রাসেলও সাথে সাথেই মহিলাটির পিছনে লাগালো এক ছুট। কিছুটা নিজের চেষ্টায় আর কিছুটা লোকজনের ধাক্কায় গ্রামের ভেতরের ছোট রাস্তাটি ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে নদীর ধার ঘেঁষে পাকা রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

মালকোছা মারা মোটাসোটা জোয়ান একজন অচেতন মানুষকে ভ্যানের উপর রেখে দশ-বারোজন লোক চতুর্দিকে ঘিরে ধরে ঘাড়ের নিচ থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্রত্যেকটি জায়গায় চোখ মুখের মধ্যে একধরনের সহানুভূতির ভাব জাগিয়ে রেখে বৃষ্টির ধারা-বর্ষণের মত কিল, ঘুষি, থাপ্পড় এমনকি মাঝে মাঝে পা উপরে তুলে লাথি পর্যন্ত মেরে চলছে। মারতে মারতে তারা অনেকেই প্রচন্ড রকমের ক্লান্ত, শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে। বালক বয়সের ছেলেরা যারা শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংশ পেশী টিপে দিচ্ছিল তাদের অনেকেরই চোখে মুখে হঠাৎ হঠাৎ দু একটা কিল থাপ্পর এসে লাগতেই তারা কিছুটা খেকিয়ে উঠে আবার শরীর টিপতে শুরু করে দেয়। এই অবিরত কিল, ঘুষি, থাপ্পর, লাত্থির চোটে নাকি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লোকটির শরীরের জমাট বাঁধা রক্ত চলাচল করতে শুরু করবে। তাতে করে লোকটি হয়তো বেঁচেও উঠতে পারে!

শামীমের উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ কালো কুচকুচে হয়ে গেছে, বুকের বাম পাশে একটি নাতিদীর্ঘ সদ্যপোড়া দাগ, মুখটি ভাবলেশহীন, বাঁ-হাতটি শরীরের একপাশে নিথর হয়ে পড়ে আছে। ডানহাতটি শিথিল ভাবে মুঠ করা, আঙ্গুলগুলো কুকড়ে কিছুটা বাঁকা হয়ে গেছে। ধরেই সাথে সাথে ছেড়ে দেওয়ার একটি চেষ্টার ছবি আঙ্গুল কয়েকটির মধ্যে এখনও অনেকটা স্পষ্ট। ঠোঁটের বাম পাশের কোনা দিয়ে বের হওয়া গ্যাঁজলা দেখে মেয়েরা মুখে কাপড় চাপা দেয়। চোখের পাতা দুটি হাট করে খোলা, ঘোলা চোখে বাঁচার আকুতিটিও যেন ইতিমধ্যে মরে গেছে।

ইলেকট্রিসিটির তার দিয়ে নগর জীবনের অনেক বিষয়ই গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে আজকাল। অজ পাড়া গ্রামগুলোতেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে অপ্রতিহত ভাবে। রাষ্ট্র এখন সমাজের বেড়া ডিঙ্গিয়ে মানুষের ঘরের ভেতরটা পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায়। রেজিষ্টার্ড ডাক্তার কতৃক মৃত ঘোষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ সাহস করে বলতেই পারলোনা, মৃত মানুষটিকে কেন শুধু শুধু টানা হেঁচড়া করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছো?

শামীমের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাবার পর টানা তিন দিন ধরে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় টানা বর্ষনের মত আলোচনা চলতে লাগল। পুরো গ্রামটি যেন তিনদিনধরে শামীমের মৃত্যু ঘটনার উপর ধলি বকের মত একপায়ে দাঁড়িয়ে শোকের পুঁটিমাছ খুটে খুটে খেতে থাকে। চরা ক্ষেতে আলের ধারে, পেকা জমিতে গোছা গাড়ার সময়, নদীর পাড়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে, সকালে দুপুরে রাত্রে খাবার খেতে খেতে এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকার নিভৃত দেখা সাক্ষাতের সময়ও একই আলোচনা। স্বামী-স্ত্রী গভীর রাতে তাদের নিজস্ব উত্তেজনার সময়, উত্তেজনা শেষে রণক্লান্ত অবস্থায় দুইদিকে মুখ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তেও শামীমের কালো হয়ে যাওয়া মুখটা স্মরনে আনে। তখন তাদের বুকের ভেতরে কি যেন একটা ইস্ক্রুপের মত মোচড় দিয়ে কলিজার ভেতর ঘচ করে ঢুকে পড়ে। পাড়াবেড়ানী বয়স্কা নারীরা তো এই ঘটনা আচলের খুঁটে বেঁধে শরীরে নতুন উদ্যমের গন্ধ মেখে বাড়ীর পর বাড়ী হেঁটে বেড়ায়। ছাত্র ছোকরারা সাইকেলে চড়ে স্কুল কলেজে যাওয়ার সময় শামীমের বিষয়ে আলোচনায় মনোযোগী হয়ে এবড়োথ্যাবড়ো পাকা রাস্তায় হঠাৎ উল্টে পড়ে। কিশোরী মেয়েরা উঠোনের মাঝখানে দাগ দিয়ে এক্কাদোক্কা খেলার মাঝখানে শামীমের চটুল টিটকিরির কথা মনে করে দম ভুলে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। তাসের আড্ডায় তাস বাটা ভুলে গিয়ে চলতে থাকে তাস খেলায় শামীমের অপটু বিষয়ে আলোচনা। মদ খাওয়ার অভ্যাস যাদের একটু- আধটু আছে তারা শোকে কাতর হয়ে গড়ের ভেতর গারো পাড়ায় বাংলা মদের আসর জমায়, তাতে করে শীতের রাত্রে এদের শরীরও একটু গরম হয়। শামীমের স্মৃতিকে স্মরন করে মদের গ্লাশ ঠোটে ছোঁয়ানোর সময় মাতাল হওয়ার বদলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে অনেকেই। শীতের রাত্রে বদ্ধ ঘরে আমেজ করে বসা জুয়ার আসরে টাকার লেনদেনের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নীরসমুখে শামীমের সাথে ঘটে যাওয়া খন্ড ঘটনাগুলো আলোচনা করতে থাকে গ্রামের সব পাকা-পাকা জুয়াড়িরা।

শোকের সময় ঢিমেতালে গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে যেতে থাকে। শামীমের এই মৃত্যু শোক মানুষের কাজে-চলাফেরায় তেমন কোন ব্যাঘাত ঘটায় বলে মনে হয় না। এবং কখনো সখনো শুধু আড্ডার আমেজই বাড়িয়ে চলে। শোক মানুষের চতুর্দিকে হালকা ধোঁয়ার কুন্ডলীর মত ঘিরে থাকে, শুধু বয়ে চলার সাথে মেপে মেপে খানিকটা করে উড়ে যেতে দেখা যায়।

ঠান্ডা আমেজের বিকেল বেলায় শামীমের জানাজা শেষ করে জাহিদ চা স্টলে আসলে- ছোটরা তার বসার জন্য বেঞ্চের খানিকটা জায়গা খালি করে দেয়। এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে দিয়ে কিছুটা কুঁজো হয়ে জাহিদ বসে পড়ে আস্তে করে। চা স্টলে ইতিমধ্যেই জানাজা শেষ করে ছোট বড় অনেকেই ভিড় জমিয়েছে- তাদের প্রায় সবার মাথাতেই জানাজার সময় পড়া টুপিটি এখনো আছে। শুধু মাত্র জাহিদই জানাজা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সার্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে। অনেক ক্ষণ বিষণ্ণ থাকতে থাকতে টুপি মাথায় দেওয়া সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বিষন্নতাকে মাটি চাপা দিতেই সবাই এই ছোট চা স্টলটিতে এসে হাজির হয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই চা স্টলের ছোট পরিসরটি হা হুতাশ আর দীর্ঘশ্বাসে জমজমাট হয়ে উঠে। আর জাহিদের বুকের ভেতর থরে থরে সাজানো ক্ষোভ-এই শোকাবহ পরিবেশে বের হওয়ার জায়গা না পেয়ে বুকের ভেতরে আকুলি বিকুলি করতে শুরু করে। সে এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে আর একটি সিগারেট ধরিয়ে ঘন ঘন টানতে থাকে। গ্রামে বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া ঘোরতর বেয়াদবী জেনেও রাশি রাশি ধোঁয়া উঠে জাহিদের মুখ থেকে যেন ইট ভাটার বিশাল বিশাল লম্বা চোঙ্গ থেকে সাদা সাদা ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ধোঁয়া নয় যেন পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষোভের গলিত বাষ্প। বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়াটাকে সে এখন আর বেয়াদবীও মনে করেনা। কিন্তু জাহিদ লক্ষ্য করে, অনেকেই তার দিকে যেন একটু কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে। জাহিদ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, শীতের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। গ্রামের লোকজন কানাঘুষা করে জাহিদ সেখানে বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে-সে নাকি আর মুসলমান নেই কম্যুনিষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ-খোদায় তার নাকি বিশ্বাস নেই। জাহিদের সবকথায় ওরা এখন কাফের কাফের গন্ধ পায়। জাহিদ কোন কথা বললেই অন্যকিছুর সন্দেহ করে গ্রামের লোকজন। জাহিদের কথায় যে যুক্তি থাকে সেগুলো যেন তাদের পাথরের চাইয়ের মত বিশ্বাসের উপর আঘাত করে। এইডা কেমন কতা, আল্লায় আমাগো না বানাইলে আমরা আইলাম কুনথিকা, আল্লায় খিলায় দেইকাইতো আমরা খাইতে পারি, বাইচা আছি, হেয় যহন ডাক দিবো তহন কি আর থাকনের উপায় আছে- হের কাছে চইল্যা যাইতে অইবো। চল্লিশটা হাতি দিয়া বাইন্ধা রাখলেই ফিরাইতে পারবো না। আল্লায় বলে নাই-এমুন কতা যে কয় তার উপরে আল্লার গজব নাইমা আহুক। দুই পাতা বই পইড়াই জজ ব্যারিষ্টার অইয়া গেছে গা না--, আল্লার উপর দিয়া কতা কইতে চায়, আল্লাই তো বেবাক কিছু বানাইছে, আর হে এতই যদি পারে তাইলে এডা পিরপা(পিঁপড়া) বানাইয়া দেহাইক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে জাহিদকে তারা মাঝে মঝেই মসজিদে নামাজের সময় সামনের কাতারে দেখতো পেতো। আর এখন হঠাৎ রাত্রিরে তারা দেখতে পায় কে একজন মাটির রাস্তা থেকে মসজিদের দিকে উঠে যাওয়া পাকা সিড়িতে বসে সিগারেট ফুকছে, জোরেশোরে একটা ধমক লাগাবে বা কষে একটা চড়- এমন ভাব নিয়ে কাছে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জাহিদের দুঃখ ভরা মুখ আবিষ্কার করে সেখান থেকে হতচিত্তে সরে আসে। জাহিদকে মাঝে মাঝেই বিষন্ন মুখে চরা ক্ষেতের আলধরে একা একা ঘুরতেও দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বলে তারা সবাই তাকে কিছুটা সমীহ করেও চলে। আর কেউ কেউ অবশ্য অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে জাহিদের কথা বলে গর্বও করে থাকে-আরে মিয়া চিনলা না, আমাগো গ্রামের জাহিদ শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বিরাট বিদ্ধান ছেলে, মোটা মোটা বই পড়ে, কতকিছু যে জানে! আর এই বছর খানেক হল জাহিদের মাঝে নেতাগোছের একটা ভাবও তারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে। জাহিদকে এখন গ্রামের লোকজন আর বুঝতে পারেনা, এখন তাকে তাদের ভিন্ন গ্রহের মানুষ বলে বোধ হয়। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকা হাবাগোবা এই ছেলেটির আকস্মিক পরিবর্তনে তারা বিস্ময়ে বুঁদ হয়ে থাকে।

শামীমের মৃত্যু ঘটনাটা যেন জাহিদ চোখের সামনে দেখতে পায়। লোকজনের কাছ থেকে শুনে শুনে ঘটনাটি যেন তার মুখস্থ হয়ে গেছে। শামীম মালকোছা মেরে বাঁশের খুটি থেকে ঝুলে পড়া হাই ভোল্টেজের তারটি ঝিয়াই তার দিয়ে বেঁধে দিতে যাচ্ছে। হাই ভোল্টেজের তারটির উপর দিয়ে প্লাস্টিকের আবরণ থাকার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের গাফিলতির কারনেই তারের উপর দিয়ে প্লাস্টিকের আবরন মুড়ে দেয়া হয়নি। এই কারনেই সে মারা গেছে, না হলে সে মারা যেতো না। গ্রামের অশিক্ষিত লোকজনের কথা শুনলে তার পিত্তি জ্বলে যায়, ভিতরে ভিতরে সে রাগে ফেটে পড়ে। আজরাইল এসে নাকি তারের উপর ওঁত পেতে বসে ছিল, যেই শামীম তারে হাত দিয়েছে তখনই আজরাইল তার জান কবজ করে ফেলেছে; এটা কোন কথা হল! কারো নাকি কোন দোষ নেই। শামীমের মৃত্যু ওখানে ওভাবে লেখা ছিল-ওর মৃত্যু নাকি ওভাবেই হবে এটাই নাকি অবধারিত। হায়াত মউতের মালিক নাকি আল্লাহ!- সেখানে কারো কিচ্ছু করার নেই- “স্বপ্নেই নাকি জানান দিয়ে গেছে” এই কথাটা মুখে মুখে বলে বেড়ানো ছাড়া। ওরা যখন মুখে মুখে ছড়া কাটে “যার মৃত্যু যেখানে নাও ভাড়া কইরা যায় সেখানে”। তখন জাহিদের শরীর যেন রক্তশুন্য হয়ে যায়, গাঁয়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠে, চোখে ঘোলা অন্ধকার ঘনিয়ে আসে-যেন তক্ষুনি টাল খেয়ে পড়ে যাবে! যত সব গন্ড মূর্খের দল। এদের জন্যই পুরো দেশটা রসাতলে গেল। নিজেরা তো কিছু বুঝবেইনা আর বুঝদার কথা বলতে গেলেই উল্টো লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে। জাহিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে কবেই তাকে সবাই মিলে গ্রাম থেকে বের করে দিত! তার ভাবতে কষ্ট হয়, এদের সাথেই সে একগ্রামে হেসে খেলে বেড়ে উঠেছে। ওর কথা শুনে তারা বলে, তুমি তো আগে এরকম আছিলানা, হঠাৎ কইরা এমন বইদল্যা গেলা কেন? আগে কত বালা আছিলা, নামাজ পড়তা, রোজা রাকতা, মুরুব্বিগো আদব-কায়দা করতা-কলি যুগ আইয়া পড়ছে, ঘোর কলি। এরা কেউ পরিবর্তন সহ্য করতে পারেনা- কারো মাঝেই কোন পরিবর্তন দেখলে তারা ভয় পেয়ে নানা কিছু সন্দেহ করতে থাকে। যে কোন ধরনের পরিবর্তন এদের কাছে অস্বাভাবিক লাগে। সারা জীবন অপরিবর্তি থাকাটাই এদের কাছে স্বাভাবিক। সবকিছু যেন স্থির চিত্রের মত যেমন আছে ঠিক তেমনটিই থাকবে- যেন ক্যামেরায় তোলা ফটো। এই এদের সাথেই ওকে এখনও বসবাস করতে হয়! ভাবতে কষ্ট হয় জাহিদের। সেই সকাল থেকে গ্রামের লোকজনকে সে বোঝানোর চেষ্টা করে আসছে-তারের উপর প্লাষ্টিকের আবরণ না থাকার কারনেই ওর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কোন লাভ নেই-সে ওদেরকে কোনভাবেই বুঝাতে সক্ষম হচ্ছেনা। অথচ সে মনে মনে প্ল্যান করে রেখেছে, এই বিষয়টা নিয়ে সে গ্রামের মোটামুটি সবাইকে সাথে একটা জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলবে কিন্তু বয়স্কদের জন্য সে এগোতে পারছেনা। এই বয়স্করাই তার যেকোন কাজে প্রথম বাঁধা দেয়। গ্রামের তরুনরা যারা এখানে স্কুলে-কলেজে লেখা-পড়া করে তাদের অনেকেই তেমন কিছু না বুঝলেও অবশ্য তার দলেই থাকে সবসময়। কিন্তু তরুনরাও এখন সবাই শোকে কাতর হয়ে আছে। যে মরে গেছে সে তো মরেই গেছে কিন্তু আর কেউ যাতে মারা না যায় সেই ব্যবস্থা যে তাদেরকেই করতে হবে এই খেয়ালটুকু কেন যে তাদের মাথায় আসছেনা!

মামুন বিয়ে করেছে এই কিছুদিন হল- শামীম মারা যাবার দিন পনের আগে পাশের গ্রাম থেকে মাথায় মুকুট পড়ে, ম্যাছতা পড়া নাকটি রুমালে চেপে, সাতটি ট্যাম্পু ভাড়া করে পুতুলের মত দেখতে একটি মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। বরযাত্রীর একজন হিসেবে শামীমও গিয়েছিল সাথে, শামীমের সেদিন সে কি ফুর্তি- সারা শরীরে হাজার পাওয়ারের রঙ মেখে-সঙ সেজে হাসতে হাসতে ফিরেছিল বাড়িতে। পাশাপাশি বাড়ি ওদের- চরা ক্ষেতে ফুটবল খেলে, নদীতে সাতার কেটে, পচা ডোবায় একসাথে মাছ ধরে, বগলে বই খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে যেতে, মারামারি করে, গলাগলি ধরে একসাথেই বড় হয়েছে দুই জন-এবং শামীম বয়সে কিছুটা বড় হলেও তুই তোকারী সম্পর্ক ছিল দুইজনের সাথে। নতুন বিয়ে করা বউয়ের সাথে কম দামী বাল্বের লাল আলোতে দো-চালা ঘরে নড়বড়ে চৌকিতে বিভিন্ন জায়গা দিয়ে তুলো বের হতে থাকা লেপের নিচে শুয়ে এগুলোই ভাবতে থাকে মামুন। বাল্য বন্ধু শামীমের জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠে, বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হতে থাকে। সেই ছোট বেলা থেকে শুরু করে আজকে সকাল পর্যন্ত জমা হওয়া পুঞ্জীভূত স্মৃতিগুলো সিনেমার রুপালী পর্দায় ছবির আলো ফেলার মতোই মনের পর্দায় চলচ্চিত্রের মত একে একে ভেসে উঠতে থাকে। সারাদিনের খাটুনির পরে শরীরে-মনে কিছুটা ক্লান্তিও সে বোধ করে সে। আজকে শরীরের উপর দিয়ে তার অনেক ধকল গেছে- সেই চরা ক্ষেত থেকে শামীমকে উঠিয়ে নিয়ে এসে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া- নাকের ডগায় চশমা ঝুলানো ডাক্তার যাওয়ার সাথে সাথেই মৃত বলে ঘোষণা করলে লাশ নিয়ে গ্রামে ফিরে আসা, কবর খোড়া, বাঁশ কাটা ওদিকে আবার লাশের গোসল করানো, জানাজার জন্য মানুষ ডাকা-ওর বাড়ির লোকজন তো সব কেঁদে কেটেই অস্থির। সেও তো কেঁদে অস্থির হতে পারত ফলে কোন কাজই তাকে করতে হতনা! অবশেষে শামীমকে কবরে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়েই কেবল মাত্র কিছুটা গা ঝাড়া দিতে পেরেছে। শামীম কবরে মাটি চাপা যাওয়ার সাথে সাথেই তার মনে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন ভঙ্গীতে গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে। শামীমের ভঙ্গী কখন ফুটবল খেলার- কখনো মারামারির- কখনো দৌড় ঝাপের- কখনো নদীতে লাফ ঝাপ সাতার কাটার- কখনো নদীতে-ডোবায়-পুকুরে মাছ মারার- বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার- মাঠে লাঙ্গল চষার-ধান কাটার- পেকা ক্ষেতে গোছা গারার। শামীমই ওকে সিগারেট খাওয়া শিখিয়েছিল। শামীমের সাথে নতুন নতুন সিগারেটে টান দেওয়ার স্মৃতি মনে হতেই তার শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে উঠে। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিয়াশলাইয়ের একখোঁচায় ধরিয়ে ফেলে ঘন ঘন টান দিতে থাকে। স্মৃতির রিলে ফিতায় সে সবশেষে দেখতে পায় শামীমের সাথে খারাপ মেয়েদের পাড়ায় যাওয়ার দৃশ্য। শামীমই তাকে ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ঐ দিনই সে নারী মাংশের স্বাদ প্রথমবারের মত পায়। হঠাৎ করে আধপোড়া সিগারেটটি হাত থেকে খসে পড়ে কড়কড়ে ঠান্ডা মাটির মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে থাকে। শক্ত তোষকের বিছানায় শরীর ঘষটে ঘষটে এগিয়ে যেতে থাকে বউয়ের দিকে। খালি হয়ে যাওয়া বুকে কি যেন সে পেতে চায়, কিসের অভাব যেন তার বুকে বাজতে থাকে দ্রিম দ্রিম করে। গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে বউকে ঝাপটিয়ে ধরে সে। পেন্সিলের মত সরু ঠোট নেড়ে কেবল কৈশোর কাটানো বউটি অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠে-আপনে কি মানুষ! জ্বলজ্যান্ত লোকটা কারেন্টে ধইরা মইরা গেল-কান্দিতে কান্দিতে আমার চোখ দুইটা ফুইল্যা গেছে। খালি কবরের কথা-কবরের আজাবের কথা মনে পড়তাছে। আর গজবের ফেরেস্তাগো আমি জানি চোখের সামনে দেকতে পাইতাছি। কোথায় একটু দোয়া দরুদ পরবো তা না, আইজকাও! সরেন আপনে-আপনে একটা অমানুষ, আমার শইল ধরবেন না, ছাড়েন কইতাছি, ছারেন অহনি। বউয়ের ভৎসনা পূর্ব রাগের মধুর বকুনির মত মনে হয় মামুনের। তার আজকের আচরনে যেন স্বামীর একঘেয়ে ক্লান্তি নেই আছে মাতাল প্রেমিকের উন্মাদনা। সে তার বউয়ের গলায় ঘাড়ে বুকে ক্ষ্যাপার মত মুখ ঘষতে থাকে। অপর পক্ষ থেকে আসা কঠিন বাঁধা মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে ভেঙ্গে যায়-পাট খড়ির উপর দিয়ে কেউ হেটে গেলে যেমন ভাঙ্গতে থাকে মড়মড় করে। কিছুক্ষনের মধ্যেই পুরুষ মাংশের গন্ধে কাতর হয়ে পড়ে বালিকাটি। ক্ষীণ স্বরে অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করতে করতে অভ্যর্থনা জানাতে থাকে। কম দামী বাল্বের সুইচটি বন্ধ করার কথাও তাদের কারুরই খেয়াল থাকেনা।

শামীমের বাল্যবন্ধু মামুন যখন বুকে প্রচন্ড শোক নিয়ে ইন্দ্রিয়ের দুর্দান্ত খেলায় মেতে উঠেছে তখন মেশিন ঘরে (চরা ক্ষেতে ইরি ধানে সেচ দেওয়ার কাজে মোটর চালিত গভীর নলকুপ ঘিরে গড়ে উঠা টিনের একচালা ঘর) তাস-জুয়ার আসর জমেছে। এবার শীত যেন বেশ ঝাকিয়ে পড়েছে-কারো গায়ে রোঁয়া ওঠা পুরনো সোয়েটার- কেউ গায়ে চাপিয়েছে ভারী জ্যাকেট, একজনের শীত লাগে একটু বেশী- পুরোনো ছেরা কাথাটা দিয়েই সে নিজেকে আগাগোড়া মুড়ে নিয়েছে, আরেক জন হালকা একটা চাদর গায়ে দিয়ে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে গিয়েছে-মনে হচ্ছে এই চারজনের বুক থেকে উঠে আসা শোকের ধোঁয়া যেন। প্রত্যেকে পা মুড়িয়ে বসে বেজার মুখে তাস পিটাচ্ছে- লুঙ্গীর টোনায় খুচরা টাকা দলামলা হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। এরা সবাই আজকে আস্তে আস্তে কথা বলছে- নিজেদেরকে পুরোমাত্রায় মেলে ধরতে পারছেনা- কোথায় যেন বাঁধছে, কি যেন তাদেরকে আটকে ধরেছে। খুচরা টাকার মত এদের ভেতরের মানুষগুলো বিভিন্ন দিক থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে সরবে বের হবে বলে কিন্তু পেরে উঠছেনা। একজন তাস বাটতে বাটতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললঃ গত কাইল রাইতে শামীম আমাগো লগে এইহানে বইস্যা তাস খেলতাছিল। আর আইজক্যা কই শুইয়া রইছে- আল্লাই জানে, আমাগোও যাইতে অইবো রে যাইতে অইবো, শামীম যেহানে গেছে। ছেড়াডা বালা মানুষ আছিলরে, খুব বালা মানুষ আছিল, এমুন মানুষ পাওয়া যায় না, বালা মানুষ বেশীদিন বাঁচে না! আরেকজন বেটে দেওয়া তাস হাতে নিতে নিতে অস্ফুট কন্ঠে বলেঃ -তয় একটু রগচটা আছিল, যহন তহন রাইগ্যা উঠতো, এই আর কি। কিছু বুঝতে চাইতোনা, গায়ের জোরে হগলকিছু করতে চাইতো, মনে অইতো ধাক্কা দিয়া পাহাড় ফালাইয়া দিবো। মাথাডারে কাজেই লাগাইতো চাইতো না-এজন্যেইতো ভর দুপুরে কারেন্টে ধইরা মইরা গেলো! কামলাগো নগে গেছে প্যাকা ক্ষেতে গোছা গাড়তে, যাইয়া দেহে বাঁশের খুটি থাইক্যা কারেন্টের তার ঝুইলা পড়ছে। বোদাই আর কারে কয়, খালি হাতে গেছে কারেন্টের তার বাঁশের খুটির সাথে বাইন্দা দিতে। কারেন্ট নাই তো কি- যে কোন সোম যে আইয়া পড়তে পারে এই খেয়ালও নাই। এইটুকু বুঝও নাই যে কারেন্ট গেতেই কতক্ষণ আর আইতেই কতক্ষন। যেই তারডা ধরছে অমনি তো কারেন্ট আইয়া পড়ছে। হয় ও ধরার কিছুক্ষণ আগেই আইছে ও টের পায়নাই, কি আর কমু অর কতা। আরেক জন তাস ছাড়তে ছাড়তে বলে-তাস খেলাও ভালো বুঝতো না শামীম। আমাগো লগে তাসের জুয়া খেইল্যা খালি ট্যাহা ক্ষতি দিত। ওর ট্যাহা লাভ কইরাইতো আমাগো সংসার চলতো-বউ পোলাপানরে দুই মুঠা খাওয়াইতে পারতাম। ঐ যে সাদেক যে বিদেশ গেলো শামীমের কাছ থিক্যা ট্যাহা লাভ কইরাইতো গেলো। আগে দেখতিনা সাদেক খালি শামীমের পিছন পিছন ঘুরতো আর সুযোগ পাইলেই অরে নিয়ে জুয়া খেলতে বইতো। এক বাপের এক পোলা আছাল যহন যা চাইতো ওর মায় অরে তাই দিত আর সোম সোম বাপের পকেট থিকাও চুরি করতো। মায়ের আদর পাইয়া লেহাপড়াডাও আর করা অইলো না। ট্যাহা আনত আর জুয়া খেইলা, মদ খাইয়া, ঘরে ডাগর বউ থাকতেও খারাপ পাড়ায় যাইয়া সব উড়াইয়া দিতো। তয় দিল দরিয়া আছিল- কত মাইনষেরে যে কত ট্যাহা কর্জ দিত তার কোন ঠিকানা নাই। যে ছেলেটা হালকা একটা চাদর গায়ে দিয়ে জুবুথুবু হয়ে বসেছিল সে একটু নড়েচড়ে উঠলো। হঠাৎ করে কি যেন তার মনে পড়ে গেল, সে তার পাশের জনকে একটু ধাক্কা দিয়ে বললঃ হোনই একটা কথা কই, কাউরে কইস না কিন্তু বলাডা জানি ঠিক না কিন্তু না বইলা ঠিক থাকতে পারতাছিনা, বুকের ভেতর খালি মোচড় পারতাছে। মাসেকখানি আগে আমিও শামীমের কাছ থিকা কিছু ট্যাহা কর্জ করছিলাম, কেউই অবশ্য জানেনা(ফিসফিস করে), পরশু দিনও আমারে জিগাইছিল ট্যাহার কতা, আমি কইছি- আর সপ্তা খানিক সবুর কর ঠিক দিয়া দিমু। এহন তো ও মইরাই গেছে, ট্যাহাডা মনে অয় আর দিতে অইবো না। অর ট্যাহার চিন্তায় রাইতে বালা ঘুম অইতো না। তগো বিশ্বাস কইরা কইলাম, কাউরেই কইসনা কিন্তু অর বাপ-মায় জানি না জানে। ওর বাপে যে লোক হুনলে চাইতেও পারে, না চাইব না মনে অয়। একটা পোলা আছাল হেই মইরা গেছে, তার কর্জ দেওয়া ট্যাহা চাইব না মনে অয়। দেক তোরা কিন্তু কইস না কাউরে, তগো খোদার দোহাই। কাঁথা গায়ে দেওয়া লোকটি খোঁচা মেরে বলে, আজকে মনে অয় তর বালা ঘুম অইবোরে।

লেপের তলায় কাচুমুচু হয়ে শুয়ে থাকা ফজলু মিয়ার কানে হালকা একটা পাখির পালকের মত ঢোকে- আসসালাতু—খাইরুম—মিনান-- নউম—আসসালাতু—খাইরুম—মিনান—নউম--। সে আড়মোড়া দিয়ে পাশ ফিরে অন্ধকারের মধ্যেই তার বউয়ের বলীরেখা আঁকা মুখ অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পায় যেন। বউয়ের থলথলে হয়ে যাওয়া শরীরে তার হাতের স্পর্শ লাগতেই বিবমিষা জাগে। অন্ধকারে হাতড়ে বেড সুইচে চাপ দিতেই সাদা ঝকঝকে আলোয় তার ঘর ভরে যায়। লেপের তলা থেকে কোনমতে নিজেকে টেনে উঠিয়ে খাটে বসে পায়ে স্যান্ডেল গলাতে গলাতে তার চোখ পড়ে হালকা নীল রঙের তরতাজা ফ্রীজটির উপর। ফ্রীজটি যেন নীল শাড়ির ঘোমটা টানা মুখে নতুন বউয়ের মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে কাছে গিয়ে ফ্রিজের গায়ে হাত বুলাতে থাকে পরম আদরে। ফুলশয্যার রাতের মত ফ্রীজটিকে তার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। ফ্রীজের পিছনদিক থেকে বের হয়ে আসা একটা শব্দের রেশ তার কানে মিষ্টি মধুর গানের কলি হয়ে প্রবেশ করে। আবেশে নতুন বউয়ের নরম হাত শক্ত মুঠিতে চেপে ধরার মত সে ফ্রীজের হাতলটি ধরে টান দিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলে। ফ্রীজে থরে থরে সাজানো কোরবানীর ঈদে জবাই করা লাল ষাড়টির মাংশ। মাংশ থেকে উঠে আসা বাষ্পীয় ধোঁয়া তাকে মেঘলোকের দেশে নিয়ে যায়। সাদা তুলোর মত মেঘগুলো যেন তার চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভেতরের স্তুপাকার মাংশগুলোকে নতুন বউয়ের ফুলে উঠা পেটে তার ঔরসজাত অভূমিষ্ঠ সন্তানের মতই মনে হয়। ত্রিশ বছর আগে বিয়ে করেছে সে- এত দিনেও সে তার বউয়ের পেটে কোন সন্তান রাখতে সমর্থ হয়নি। কয়েকবছর আগ পর্যন্তও তার আশা ছিল কিন্তু ডাক্তার যখন শেষবারের মত বলে দিল সমস্যা নাকি তারই, সে একশো একটা বিয়ে করলেও নাকি তার সন্তান হবেনা। বউয়ের সমস্যা থাকলে না হয় সে আরেকটা বিয়ে করে ফেলত কিন্তু এখন সে তো তার বউকে আরেকজনের কাছে পাঠাতে পারেনা! তারপর সে ফ্রীজের নিচের ঢাকনাটি খুলে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়- যাক এখানে তাহলে কিছুটা জায়গা খালি আছে। সে খুব ভেবে চিন্তেই বেশ বড় একটা ফ্রীজ কিনেছে, টাকা যদিও একটু বেশী লেগেছে! কত কাজেই তো লাগতে পারে- সে কথা কি আর আগে থেকে ভেবে রাখা যায়। যত বেশী জমিয়ে রাখা যায় ততই ভালো। আজকেও তো কিছু জমাতে হবে-রেখে রেখে খেতে হবে। নিয়ে আসা যায় একবারে অনেক কিছু কিন্তু একবারে তো আর সব খেয়ে শেষ করে ফেলা যায় না, খেতে হয় ধীরে ধীরে।

আজকে শামীমের মৃত্যুর তিনদিন হলো-শামীমের বাবা কিছুদিন পরে করতে চেয়েছিল অবশ্য। এই ফজলু মিয়াইতো(বুকটা ইঞ্চি দুয়েক ফুলে উঠে) তাকে তাড়া দিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে আজকের দিনটাই ঠিক করেছে। দেরী করে কী লাভ বল, করতে যখন হবেই তাড়াতাড়িই করে ফেলাই তো ভালো। মরার খরচের কাজটা করে ফেললেই তোমার ছেলে কবরে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। আর করবে যেহেতু বেশ বড় করেই করো না কেন; সারা গ্রামের লোকজন খাবে, তোমার আত্মীয়স্বজনও তো কম নয়, তাই না? পেট পুরে খেয়ে দেয়ে যেন সবাই প্রাণ খুলে তোমার মরা ছেলের রুহুর জন্য দোয়া করতে পারে, সেই ব্যাবস্থা করতে না পারলে আর খরচ করা কেন! আর গ্রামে তোমার মর্যাদার কথাও তো তোমাকেই ভাবতে হবে, অন্যে তো আর সেটা ভেবে দিয়ে যাবেনা। ছোট করে করলে এলাকার লোকজন কি ভাববে বলতো? সবকিছুই তো খেয়াল রাখতে হয়। তুমি তো আর যেই সেই মানুষ নও। কি বলছো, টাকায় টান পড়বে, আরে কি যে বলো তুমি, আমি থাকতে ও কথা একদম মুখে এনো না। দু-জোড়া বলদ আর দুইটা মোটা সোটা খাসি হলেই তো তোমার চলে যাবে, নাকি বল? টাকা তুমি দিও যখন পার, আসল টাকাটা তাড়াতাড়ি দিতে না পারলে শুধু মাসে মাসে কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে গেলেই চলবে। আরে সুদ বলছো কি, সুদ হবে কেনো, ছি-ছি-ছি কি যে বলো তুমি!সুদের কারবার আমি করিনা, মানুষের বিপদ দেখলে পাশে গিয়ে দাড়াই। সেও যাতে আমার পাশে থাকে সবসময়। আমি তোমার বিপদ দেখলাম আর মাসে মাসে আমার বিপদ হলে সেটা একটু দেখবে, এই আর কি। মাতব্বর মানুষ তোমাদের সেবাযত্ন করেই দিন কেটে যায়। তোমাদের মত গায়ে খেটে তো আর উপার্জন করতে পারিনা। আরে- না—না- কি যে বলো তুমি, তোমার মাথা দেখি একবারে গিয়েছে বেশী রাখবো কেনো, তোমার বিপদের সময়, অন্যদের কাছ থেকে যা রাখি তার চেয়ে কিছু কমই রাখবো- ও নিয়ে তুমি একদম চিন্তা করোনা। টাকা তো আমার ঘরেই পড়ে থাকতো তাই না! আর আয়োজনের জন্য যে লোকজন লাগবে সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা, হাসালে আমাকে বড়! আমার লোক সব থাকবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, আর আমিও থাকবো সেই সকাল বেলায় গরু জবাই থেকে একেবারে পাতা ফেলা পর্যন্ত। ওরা তো আর টাকা পয়সা চাইতে আসবেনা তোমার কাছে, আর তার দরকারও নেই। শুধু দাওয়াত শেষে যদি কিছু মাংশ দই বেশী হয় সেখান থেকে কিছু দিয়ে দিলেই চলবে। আর সেটা নিয়েও তোমাকে ভাবতে হবে না- বারা খোরা তো সব ওরাই করবে, ওদেরটা ওরাই ভালো বুঝে নেবে। ফজলু মিয়া বলতে বলতে হঠাৎ করে অন্যমনস্ক হয়ে বলে ফেলেছিল, জানো তো আমি একটা বেশ বড় একটা ফ্রীজ কিনে ফেলেছি, কোরবানীর মাংশ রাখার পরও ঢের জায়গা এখনো বাকী আছে।

পুরো গ্রাম উৎসবে মেতে উঠেছে। সবাই দল বেঁধে ছুটে আসছে শামীমদের বাড়ির দিকে, গ্রামের কারো বাড়িতেই আজ দুপুর বেলা হাড়ি চড়েনি। দাওয়াত বাড়ীর চারপাশে কুকুর গুলো বিরতিহীন ঘেউ ঘেউ করছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হাঠৎ হঠাৎ দু একটি মোটাতাজা কুকুরকে গরুর লম্বা লম্বা হাড় নিয়ে দৌড়ে যেতে দেখে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠে। হাড়জিরজিরে কিছু কুকুর ও বিড়ালকে ঘেঁষাঘেঁষি করে কলার পাতায় লোকজনের রেখে যাওয়া ছড়ানো ছিটানো কিছু ভাত, মাংশের ঝোল, ঘোল দই চেটে চেটে খেতে দেখে দুই একটি ছেলে ছোকরা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। সারা দিন না খেতে পাওয়া ছাগলগুলোর ভ্যা ভ্যা করে ডাকে- নাভীর নিচে গোজ দিয়ে শাড়ি পড়া সদ্য গজে উঠা তরুনীদের কান ঝালাপালা হয়। ওরা তো আর গরুর হাড় চিবিয়ে খেতে জানেনা, দু একটি ছাগল ঘুরে ঘুরে নীরস কলা পাতা চিবায়। কাকগুলো বাড়ীর উপরে উড়ে উড়ে পাকদিয়ে চলেছে, তাদের কা-কা শব্দ ভদ্রলোকদের বিরক্তির মাত্রা বাড়িয়ে চলে-ছোটলোকদের ভাত, তরকারী, ডাল চেয়ে চিল্লাচিল্লিতে এমনিতেই তারা যারপরনাই বিরক্ত। গরু মারার খবর পেয়ে কয়েকটি শকুনও এসে জুটেছে। সেই সকাল থেকে তারা বাড়ীর পাশেই চরাক্ষেতে চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে শুধু দু-একটির ডানা ঝাপটানির আওয়াজ পেয়ে গ্রামের মুরুব্বীরা মনে মনে ঘোরতর অমঙ্গলের আশংকা করতে থাকে।

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

ছোটগল্প - মৌ দাশগুপ্ত

“বলাই” বাহুল্য


বিয়ের পনের বছর পরেও বাঁজা অপবাদ ঘুচল না সুরমার। উঠতে বসতে শাশুড়ীর খোঁটা আর যখন সহ্য হল না তখন স্বামী শ্রীনাথের হাতে পায়ে ধরে ওর বড় ননদ কাজলের যমজ ছেলে “কানাই-বলাই” এর মধ্যে থেকে বলাইকে দত্তক নিল সুরমা।

ঘরের মধ্যে শ্রীনাথের অবস্থাই ভাল, বড়লোক শ্বশুরের কল্যাণে প্রোমোটারি করে বেশ দুপয়সার মুখ দেখেছে, অতএব ওর সাথে সুসম্পর্ক রাখতে সবাই আগ্রহী। ছোট ননদ লতারও দুই ছেলে, সেও চেয়েছিল বৌদি যেন তার এক ছেলেকে দত্তক নেয়। কিন্তু শাশুড়ীর ইশারায় শিকে ছিঁড়ল কাজলের ভাগ্যে। সুরমার ছেলে পাওয়া নিয়ে কথা, কিন্তু দুই বোনে একটু মন কষাকষি হয়ে গেল ওর অজান্তেই।

ছেলে পেয়ে সুরমারা স্বামী-স্ত্রী খুশি হলেও, ব্যাপারটা ভাল ভাবে নিল না ছোট নন্দাই আদিনাথ। গ্রামের একমাত্র হাতুড়ে ডাক্তার আদিনাথ আবার এবাড়ির গৃহ-চিকিৎসকও বটে। ফলে ঘরের অনেক গোপন(গুহ্য) কথা ওর জানা। এদিকে শালাজ নন্দাইয়ের সম্পর্কটাও বড় মধুর, তাই ঠাট্টা-ইয়ার্কি চলেই। আদিনাথ একদিন কথায় কথায় জানাল সন্তানহীনতাটা সুরমার দোষ নয়, প্রয়োজনে ও প্রমাণও দিতে পারবে। আদিনাথ লোকটা বড় নাছোড়বান্দা, তাই খানিক ইতস্তত করলেও, নিজের সক্ষমতাটা জেনে নিতে প্রমান যাচাইয়ে রাজী হয়ে গেল সুরমা। তারপর, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সুরমার কোল আলো করে এল সিদ্ধিনাথ। সুরমার ঘরে এখন চাঁদের হাট ...

অন্য খবর??

“বলাই” বাহুল্য...

গল্পকথা - সায়ক চক্রবর্তী

চিহ্ন


বেঁচে থাকার সংজ্ঞা সম্পর্কে তখনও একটা সুস্পষ্ট ধারণা জন্মেনি। বয়স নিতান্তই কম হওয়ায় এইসব গুরুগম্ভীর বিষয় মাথায় ঢুকত ঠিকই কিন্তু স্থায়ী হত না। এভাবে এক একটা বসন্ত আসা যাওয়া করছিল নিজের মনে। আমাদের পাশের বাড়িতে এক নতুন ভাড়াটিয়া এলো। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই কি ছুঁই, ভদ্রলোকের নাম তরুণ রায়, ধাম কলকাতা কিন্তু এখানে এসেছেন একটা যে কাজে সে কাজের জন্য আমাদের এলাকা সত্যি যোগ্যতম। কাজটা হল লেখালেখি। আমাদের এলাকা নন্দন কানন না হলেও দু একজন দেবতুল্য মানুষ আসেন বটে বেড়াতে। প্রকৃতি যেন নিখুঁত করে সাজিয়েছে এই গ্রাম। আমি রক্তিম। আমি আপাতত বাবার হোটেলের ভাত ধ্বংস করে সেই শক্তিতে দু একটা কবিতা গপ্প লেখার চেষ্টা করছি দিনরাত আর তাই একটু আধটু বুঝি। তরুণ রায়ের লেখা যখন আমি পড়লাম তখন যেন হাতে স্বর্গ পেলাম। হাতের কাছেই গুরুদেব, বৃথা দৌড়ে কাজ কি? আমি প্রায় ওনার চ্যালা হয়ে গেলাম। এরকম দক্ষতা এবং সাহিত্যের উপর দখল আমি এর আগে কাউকে দেখিনি অথচ ভাগ্যের গায়ে শ্যাওলা পড়ে পিছলে গেছে খ্যাতি। নাম নেই একফোঁটা, কিন্তু এতে তার দুঃখও নেই। অনেকবার উনি চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানোর, কোথাও ছাপেনি। উল্টে কোন কোন জায়গা থেকে তো এমন উত্তর এসেছে যে আমি হলে পিণ্ডি চটকে ছেড়ে দিতাম সম্পাদকের। একদিন জিজ্ঞেস করলাম – ‘ আচ্ছা জেঠু, জীবনের উদ্দেশ্য কি?’ তিনি বললেন – ‘ জীবন মানে চিহ্ন’। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম ওনার মুখের দিকে। ভাসা ভাসা কিছু তরঙ্গ আমার মননকে ছুঁয়ে গেলো।সেদিন আর কোন কথা হয়নি। উনি একটা পত্রিকায় লেখা পাঠাবেন বলে একটা গল্প লিখছিলেন। আমি বলে উঠলাম – ‘আবার পাঠাবেন? এরা তো আপনার লেখার কদর বোঝে না!, উনি একটু লিখে ; বললেন – ‘একদিন বুঝবে - শেষদিন বুঝবে।‘ আমি আবার থ হয়ে গেলাম। আর বাক্যব্যায় না করে বাড়ী ফিরে এলাম। এভাবে দিনের পর দিন ওনার সান্নিধ্য পেয়ে তখন আমিও একটু পাতে দেবার মত লিখতে শুরু করেছি। অনেকগুলো বছর এভাবে কেটে গেছে যেমন যায়।

সেদিন খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমি সন্ধ্যায় জেঠুর বাড়ী গিয়ে দেখলাম – কলম চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আশেপাশের লোকজনদের খবর দিলাম। এরপর কয়েকমাস কেটে গেছে। হঠাৎ একটা জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম ওনার লেখা ছাপা হয়েছে। দেখে যে আনন্দটা পেলাম সেটা চোখের জলের সাথেই ধুয়ে চলে গেলো। কয়েক সপ্তাহ পর আবার একটা লেখা... এভাবে প্রায় দু তিন মাস পর এখানে ওখানে ওনার লেখা... আলোচনা... বাড়িতে বুদ্ধিজীবীদের ঢল... পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ... চলল ২ বছর আরও। এখন তরুণ রায় বাংলার অন্যতম এক খ্যাতনামা সাহিত্যিক। দুদিন আগে আমি অফিস থেকে এসে যথারীতি চা খাচ্ছি আর বই নিয়ে বসেছি। হঠাৎ মনে হল – ‘ আমি ওনাকে কি কম ভালবাসতাম নাকি শ্রদ্ধাভক্তি কম ছিল? তেমন তো অভাব বোধ করছি না! কারণটা কি!’। টেবিলে ওঁর লেখা বইয়ের স্তূপ দেখে উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি আজকাল অফিসে যাই না। আঁচড় কাটি সাদা পাতায় যদি একটা দাগ স্পষ্ট হয়ে। ইচ্ছে করে আমারও টেবিলে পড়ে থাকতে – উদাস অথচ উজ্জ্বল!

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১২

কাশীনাথ গুঁই

সুরভী


মধুমতীর বাঁকের ছোট গাঁয়ের চাষার ছেলে অনি।ওর বাবা পণ্ডিতমশায়ের ভাগচাষী।অনিকে পরের জমিতে ঘাম ঝরিয়ে তেভাগার অকাট মুখ্যু না হতে হয় এই ছিল তার আশা।তাই হাতে পায়ে ধরায় অনিকে ভর্তির ব্যবস্থা করেন পণ্ডিতমশায়।সে ছেলে যে আধপেটা খেয়ে মলাটহীন আধছেঁড়া বই ঘেঁটে ফিবছর ক্লাসে ফার্ট হবে কে জানতো সেকথা।

সুরভী পণ্ডিতমশায়ের বড় নাতনী। সে এখন ক্লাস এইট। ছোটবেলা থেকেই পাড়ার ভাল ছেলে অনির কাছে পড়ার সময় পড়া বুঝেছে এক্কাদোক্কার সাথী হয়েছে।পড়া শেষে সূয্যি পাটে বসার সময় মাঠের ধারে দিঘির পাড়ে বসে ঘাস চিবোতে চিবোতে সূয্যিটাকে দিগবলয়ে লুকোচুরি খেলতে দেখেছে।মধুমতীর বুকে নৌকা বাইচের উত্তেজনায় বুকে হাপর টানতে টানতে অনির পিঠে মুখ লুকিয়েছে।

অনির মাধ্যমিকের বছর সুরভী ক্লাস নাইনে উঠতেই তার বাবা তাকে নিয়ে গিয়ে কর্মস্থল কলকাতার এক ভাল স্কুলে ভর্তি করে দিল।পূজোর ছুটিতে এসে সুরভী অনির পরীক্ষায় লেখার জন্য পার্কার ফাউন্টেন পেনটা দিয়ে ওকে মনে রাখতে বলেছিল।ভাইফোঁটার বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে ঘটিম দিয়ে মুক্ত অক্ষরে নিজের নামটা মন্দিরের দেওয়ালে লিখে অনির কানে কানে কি যেন বলেছিল।

পরদিন সুরভী কলকাতা চলে যাওয়ার আগে অনিকে টানতে টানতে আবার মন্দিরে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ একটা প্রণাম করে হাত পেতেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠোঁটে একটা গরম ছ্যাঁকা টের পেয়ছিল অনি। ততক্ষণে সুরভী হরিণীর মত নাগালের বাইরে।শহরে যাওয়ার সময় খেয়াঘাটে ফের একবার সুরভীর চোখে কি যেন পড়ে নিল অনি।সেই রাতেই অনির রাতজাগার হাতেখড়ি হল।

মাধ্যমিকের ফল গাঁয়ের মুখ উজ্জ্বল করলেও অনি আরও ভাল করতেই পারতো।তবু জেলার দ্বিতীয় স্থানটা ওর দখলে রেখছে অনি। তাই নারাণঞ্জের স্কুলে ভর্তি হতেও অসুবিধে হল না।কিন্তু কোঁচরে মুড়ি বেঁধে রোজ যাতায়াতে ওর শরীরটা বেশ ভেঙ্গে পড়ল।মনটাও ওর সঙ্গে শত্রুতা করতে ছাড়ল না।খেয়াঘাটে যাতায়াতে মন্দিরটা এড়িয়ে যাওয়ার পথ ছিল না যে।রাতের আকাশে তারাদের ভীড়ে সেই হাতপাতা মুখটা ওর ক্লান্ত শরীরটাকেও ঘুমের ঘরে যেতে দিতে চাইত না।

উচ্চ মাধ্যমিকের ফল শহরের সেরাদের মাঝামাঝিতে নামাল অনিকে।ফল বেরোনোর দুদিন আগেই ওর বাবা সাংসারিক মায়া ত্যাগ করে অনির ভাগচাষীর ছেলের পরিচয়টার সাথে দুমুঠোর ব্যবস্থাটাও কেড়ে নিল।অগত্যা অনি রোজগারের আশায় কলকাতামুখো হচ্ছে শুনে পণ্ডিতমশায় ডেকে পাঠালেন ওকে।কলকাতা শহরের জীবনে কত কঠিন প্রতিযোগীতা ও নিদারুন পরিণতি সেকথা বুঝিয়ে অনিকে নিবৃত্ত করলেন পোড়খেকো মানুষটি।ওনার পরিচিত নারাণঞ্জের একটা মোটর গ্যারজে শিক্ষানবীশ হিসেবে কিছু রোজগারের বন্দোবস্তও করে দিলেন তিনি।নাহলে সুরভী আর তার বাবা এ ছেলে উপর দুর্বল হয়ে আরও পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দিলে বিপত্তি বাড়বে মোক্ষম। এ ছেলে যে একদিন জাতে উঠে তাঁর বংশে চুনকালি মাখাবে তা তিনি অনক আগে টের পেয়েই তো সুরভিকে কলকাতা ঠেলছিলেন।

মা আর বোনের দায় টানতে টানতেও অনি একদিন একটা গ্যরাজের সুযোগ্য মালিক হল বৈকি। বোনকে জেদ করে কলকাতাতেই সুপাত্রস্থ করলও সে।তখনই জানল যে সুরভি আর তার নেই।বোনের বিয়ের পর ওর মায়ের খুব শখ হয়েছিল বৌরান্না ভাত খাওয়ার।নানা অছিলায় অনির এড়িয়ে যাওয়াতে কারণ বুঝতেও দেরী হয়নি মায়ের।মেয়ের মেয়েকে আদর করতে করতেই এক বিকলে তার চোখে চির সন্ধ্যা নেমে এল।

বোনের আগ্রহে আর আপন মনের নিভৃত কোন বাসনার টানে অনি একদিন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের পাশে তার ছোট্ট গ্যারেজ খুলে বসল।গুরুমশাইকে কথা দিয়েছিল অনি কখনও দখিন কলকাতামুখো হবে না। সেকথাও রেখেছে সে।অল্প দিনেই সুনামও এল তার।এল না শুধু সে, যার প্রতিক্ষায় তার এই মন্দির পাশে কাজের ছুতোয় বসে থাকা।

সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১২

মৌ দাশগুপ্তা

মানিকজোড়

পলাশ আর মন্দার দুই বন্ধু, বড় ভাব দুজনের। এক্কেবারে মানিকজোড়। যদিও দুজনের চেহারা-পত্তর, স্বভাব-চরিতর, এমনকি পছন্দ-অপছন্দের অবধি কোন মিল নেই।যেমন পলাশ বলে, “ আমার বউ হবে দারুন সুন্দরী, একদম ফাটাফাটি, ধবধবে ফরসা, টানা টানা পটলচেরা চোখ,বেশ সুরেলা গলা হবে, গান টানও জানবে, বাপের মালকড়িও থাকবে, ঐ একদম শো কেস এ সাজানো ডল পুতুলটি যেন।“মন্দার বলে “ না বাবা আমার ঐ রকম ডল ফল চাইনে, আমার বউটা বেশ পড়াশুনো জানবে, নিজেই চাকরি বাকরি করে ঘরে টাকা পয়সা আনবে আর হেভী রাঁধবে।“

যথাসময়ে দুজনেই ছাদনা তলায় হাজির হোল। পলাশের বউ পলা অল্প বয়সেই বাবা মাকে হারিয়ে মামাবাড়ীতে খুব অনাদরে মানুষ। কালো, দোহারা চেহারা, অনেকটা মঙ্গোলীয় ধাঁচের বোঁচা বোঁচা মুখচোখ, তবে ভারতীয় সঞ্চার নিগমে ভালো পোস্টে চাকরী করে। গান শুনতে হয়তো ভালবাসে তবে গাইতে পারে না। খুব ছোটবেলায় একবার মেনিনজাইটিস হয়েছিল, সে যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলেও গলাটা চির জীবনের মত ফ্যাঁসফ্যাঁসে হয়ে গেছে। ঘরজামাই মন্দারের বউ মন্দাকিনী বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে।নাম যাই হোক, সামনে এলে তাকিয়ে থাকতে হয় এমন সুন্দরী তবে কিনা বড্ড সিনেমার পোকা।বিদ্যে ঐ ক্লাস এইট।তবে নাচ টাচ জানে, রাগপ্রধান ও গাইতে পারে।সিনেমায় নামার ইচ্ছা হয়তো ছিল কিন্তু বাবার আপত্তিতে নামা আর হয়নি। মন্দারের বদরাগী শ্বশুরমশাই স্বভাবে কৃপন মানুষ। লোকে বলে হাত দিয়ে নাকি জল গলেনা। এক ঐ মেয়ের বেলাতেই কিছুটা ছাড়,তা বলে জামাইয়ের বেলায় নয়। মন্দাকিনী মানুষটাও অসম্ভব মেজাজী,এক গ্লাস জল অবধি গড়িয়ে খেতে শেখে নি।ঐ বড়লোক বাপের আদুরে মেয়েরা যেমন হয় আরকি!

পলাশ আর মন্দার কেউ আর কারো বাড়ী যায়না এখন। রাস্তায় দেখা হলে অনেক কথা বললেও কেউ ভুল করেও বলে না ” আচ্ছা বউ নিয়ে আমার বাড়ী যাস, জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।বরঞ্চ সন্তর্পনে যে যার বউয়র প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়।কি দরকার বাবা খাল কেটে কুমীর আনার! পলাশ আর মন্দার দুজনেই তাদের বউদের বড় বাধ্য। এই এক ব্যাপারে দু বন্ধুর ভারী মিল। যেমন ঐ মানিকজোড়দের হয় আর কি।

শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

মৌ দাশগুপ্তা

নীড় ছোট, ক্ষতি নেই

কবিবন্ধু নীল আর ওর বউ আঁখির একান্ত অনুরোধে অনেকদিন পরে শ্রাবনমাসের রবিবারের সকালটাকে চোখ মেলে দেখতে দেখতে চলেছি কলকাতা শহর ছাড়িয়ে শহরতলীর পথে। প্রবাসী চোখে যাচাই করছি কতটা পালটে গেছে আমার চিরচেনা শহরের পটভূমি!

নীল আর আঁখি দুজনেই আমার ছোটবেলার বন্ধু, একপাড়াতেই বড় হওয়া, স্কুল
থেকে কলেজে যাওয়া, বৈবাহিক সূ্ত্রে বাংলার বাইরে থাকলেও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের বদাণ্যতায় যোগাযোগে ভাঁটা পড়েনি। নীলের খুব ছোটবেলাতেই বাবা মা মারা যাবার কারণে ও ওর ঠাকুরদার কাছেই বড় হয়েছে। রুদ্রদাদু আমাদেরও খুব আপনজন.আজ সেই রুদ্রদাদুর পারলৌকিক কাজ উপলক্ষ্যেই যাচ্ছি। যতটা না রুদ্রদাদুর টানে,তার থেকে অনেক বেশী নীল,আঁখির মত ছোটবেলার বন্ধুদের টানে,পিছে ফেলে আসা বাল্যকালের সেই গাছপালা,পুকুরঘাট,স্কুলবাড়ী,খেলার মাঠ,ঝোপ জঙ্গল,মেঠোপথ,রাস্তাঘাটের টানে। অবশ্য মিথ্যে বলব না, ঠিক এই সময়েই হঠাৎ করে কলকাতায় সপ্তাহখানেকের একটা অফিসিয়াল ট্যুর পেয়ে যাওয়ায় আসার তাগিদটাও জোরালো হয়েছে। তার জন্য অবশ্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি,তবে সে প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর। নীল ওদের বসতবাড়ীটা এক  সংস্থাকে
দান করে দিয়েছে, রুদ্রদাদুর কাজের দিনই ওখানে ওই  সংস্থা তাদের নতুন একটি বৃদ্ধাশ্রম শাখার উদ্বোধন করছে, “নীড়”। সে অনুষ্ঠান দেখার আগ্রহটাও ষোলোআনা আছে।।

যাবার পরে বুঝলাম, না আসলে সত্যিই অনেক কিছু মিস করতাম, অনেককে মিস
করতাম। আমার এখন আসা হয় কালেভদ্রে, কারো সাথেই সেভাবে দেখা সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনা, এবার একজায়গায় একসাথে অনেককে পেয়ে গেলাম। পুরানো বন্ধু, পুরানো পাড়ার মামা-মামী, কাকা কাকী, দাদা-বৌদি, দিদি-জাম্বুদের,অনেক নতুন মুখও দেখলাম। বেশ লাগছিল।

এক প্রাক্তন শিক্ষিকার সাথে দেখা হল, অবসরের পরে সমাজসেবা নিয়ে ব্যস্ত
আছেন শুনলাম। প্রনাম করে কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম - অবসর জীবন কেমন কাটছে ।
উত্তরে তিনি জানালেন-
- ভালই, তবে খুব ব্যস্ত।
- কি নিয়ে?
- এই নিন্দা জ্ঞাপন, শোকজ্ঞাপন ও অভিনন্দন জানানো নিয়ে
- মানে?
- কেউ খারাপ কিছু করলে তার জন্য নিন্দা জ্ঞাপন, কেউ মারা গেলে তার জন্য শোক জ্ঞাপন আর কেউ ভাল কিছু করলে তাকে অভিনন্দন জানানো।
- এতে আসলে কি হয়, বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু যদি বিষয়টা পরিস্কার করে বলতেন!!
- আমি যে এখনও আছি এটা জনগণকে জানানো মানে জনগনের সাথে ক্লোজ কন্ট্যাক্টে থাকা আর কি।
আর কথা বাড়ালাম না, বুঝলাম পরিবর্তন সব জায়গাতেই ছায়া ফেলছে। হঠাৎই মনে পড়ল আমাদের স্কুলের বড়দিদিমনির কথা, বিখ্যাত বিপ্লবী সতীশ সেনের ভাগ্নী, সেই সময়কার ট্রিপল এম.এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার গায়েত্রী সেনগুপ্তার কথা।বেঁচে থাকলে এই পরিবর্তন কি গায়েত্রী দিদিমনির ওপরও এভাবে ছায়া ফেলত?

বেশ কাটলো সারাদিন, সেদিন আর ফেরা হোল না, ঠিক করলাম পরদিন একটু ঘুরে
ফিরে এর -তার সাথে দেখা করার কাজটা সেরে নেব। আঁখি বললো সারাদিন সঙ্গ দেবে। সুবিধাই হোল। রাতে খেতে বসে নীলই প্রথম প্রসঙ্গটা তুললো। ও নীড়ের ট্রাস্টিবোর্ডের মেম্বার, নীড়ে দু’টো সীট আছে যে দু’টো স্পনসরশীপের ওপর চলে। অনেকেই আছেন যাঁরা এই সংস্থায় মাসিক আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকেন। আর্থিক সঙ্গতি আছে এমন চেনাশোনা সবার কাছেই খুব সামান্য অনুদান চাওয়া হয়। তারপরে কে দেবে আর কে দেবে না সে তাদের ব্যক্তিগত
সমস্যা। বললাম-
- আন্দাজ কি রকম দেয় লোকে?
মুখে ভাতের গ্রাস তুলতে গিয়ে হেসে ফেলে নীল বললো-
- তার কোন ঠিক আছে নাকি? ৫০ থেকে ৫০০, বেশী কম ও হয়, কতলোক তো দেব বলেও
দেয় না,কেউ এক দু’বার দিয়েই বন্ধ করে দেয়।ঠিক আছে নাকি?তোকেও জোর করছি না মিষ্টু, ইচ্ছা হলে দিবি, ইচ্ছা না হলে দিবি না, আর দিসই যদি কত দিবি সেটা তুই-ই ঠিক করবি, আমরা নাক গলাবো না।
আঁখি বললো-
- একটা কাজ করি মিষ্টু, আজ তো এখানে নীড়ের সবে উদ্বোধন হল, আবাসিকরা সবাই আসে নি। কাল চল তুই আর আমি বরঞ্চ ওদের নিমতা শাখাটা দেখে আসি। আগে কত ঘনঘন যেতাম, আজকাল নীলেরও সময় হয় না আর আমারও কলেজের ফাঁকে সময় পাই না। দাদুভাইয়ের অসুখটাও এমন সময়ে হল, দাদুভায়ের এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রথম ওখানে যাওয়া, এত ভালো লেগেছিল না রে মিষ্টু, রবিবার আসলেই মন টানতো। নিজের চোখে দেখার পরে নীড় সম্বন্ধে কিছুটা বেশী জানতে পারবি।

সাধু প্রস্তাব, কাল আমারও দারুন জরুরী কোন কাজ নেই, তো রাজী হয়ে
গেলাম। তা হলেও ঘুরে ফিরে কাজ মিটিয়ে নীড়ের নিমতা শাখায় পৌঁছতে পৌঁছাতে সন্ধ্যে হয়ে এল। দোষটা আমার নয়, আঁখি প্রায় মাস সাত আটেক পরে ওখানে যাচ্ছে বলে সবার নামে নামে খুটখাট ছোটমোট জিনিষ কেনাকাটি করেছে আর আমায় এ দোকান থেকে সে দোকান ঘুরিয়ে মেরেছে। আকাশ জুড়ে সেদিন জোৎস্নার ঢল নেমেছে, লোডশেডিং চলছিল বলে আরও ভালো লাগছিল জোৎস্নাটা। দেখতে দেখতে চাঁদ ছাপিয়ে উড়ে এল দামাল কালো মেঘ। চারপাশটা আরো অন্ধকার করে ঝেঁপে বৃষ্টি এল।

ছোট্ দোতলা বাড়ী, শান্ত পরিবেশ, অন্ধকারে বিশেষ কিছু আর দেখতে পেলাম
  না। ফিসঘরে একজন রোগা চেহারার হাসিমুখের ভদ্রমহিলা এমারজেন্সি লাইট জ্বেলে বসে ছিলেন। আঁখিকে যেভাবে সাদরে অভ্যর্থনা করলেন, বুঝলাম, ভালোই চেনেন। এটাসেটা দু এটা কথা বলে আঁখি বললো,
- ওঠ মিষ্টু, সবার সাথে দেখা করে আসি।
বলে ওর সারপ্রাইজ গিফ্টভরা ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা দিল, পিছন পিছন আমিও। ওর তালিকা থেকে একজন মারা গেছেন, দু’জন আপাতত হসপিটালাইজড, একজনকে প্রবাসী মেয়ে এসে বাড়ী নিয়ে গেছেন। তিনজনকে শারিরীক কারনে অন্য শাখায় পাঠানো হয়েছে। দু’জন নতুন এসেছেন। ঘুরতে ফিরতে হাসিদি (আসল নামটা জানি না) খবরগুলো দিলেন। দুজনের একজন রয়েছেন সেই স্পনসরড সীটে, খুব অসুস্থ, বিনাচিকিৎসায় কোন এক সরকারী হাসপাতালের বারান্দায় ধুঁকছিলেন, সহৃদয় কেউ এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। লম্বাটে একটেরে  ঘরে পরপর ছয়জনের থাকার ব্যাবস্থা। একদম দেওয়াল ঘেঁষে জানলার পাশের বেডটায় যিনি শুয়েছিলেন তাকে দেখিয়ে হাসিদি কথাগুলো বললেন। আমরা পাশে গিয়ে দাঁড়াতে খুব ক্ষীন কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন -
- যাও তো, জানালাটা খুলে মোমবাতিটা নিভিয়ে দাও। জ্যোৎস্না আসুক।”
- বড্ড বৃষ্টি বাইরে মাসীমা, আর মশাও ঢুকবে যে, -নরমভাবে হাসিদি বললেন।
-“জানালা দিয়ে এখন বৃষ্টি ভেঙ্গে নেমেছে লাগছে! সেটা আবার ঝপঝুপে শব্দের মাঝে! বড় অদ্ভুদ সে দৃশ্য। ভগবানের অমর সৃষ্টি, মানুষের আয়ূ আর কদিন? যা পারি দেখে নিই।”
সরে যাচ্ছিলাম, শুনতে পেলাম আপনমনে উনি বলছিলেন-
-“রোদের মাঝে যেমন বৃষ্টি নামে, তেমনি জ্যোৎস্নার মাঝে বৃষ্টি নামে নাকি? দেখতে খুব ইচ্ছা করছে। এক সাথে বৃষ্টি আর বাঁধভাঙ্গা জ্যোৎস্না....এ জীবনে আর দেখা হল না।”
“এক সাথে বৃষ্টি আর বাঁধভাঙ্গা জ্যোৎস্না.”???? বড্ড চেনা কথাগুলো, কোথায় যেন শুনেছি, ঠিক মনে পড়ছিল না, বাইরে সজোরে বিদুৎ চমকালো, লাইটগুলোও জ্বলে উঠল। আমরা দুজন একসাথে পিছিয়ে এসে ঝুঁকে পড়লাম ভদ্রমহিলাকে ভালো করে দেখতে।
- প্রভা দিদিমনি? এ কি চেহারা হয়েছে আপনার?
স্কুলে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা ছিলেন এই প্রভা দিদিমনি । আমাদের কি সুন্দর করে যে বাংলা পড়াতেন, কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর কি সরলভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বাড়ী গিয়ে আর মানেবই পড়র দরকার পড়ত না। অথচ মাধ্যমিকের ঠিক আগে কাউকে কিছু না বলে কেন যে আসা বন্ধ করে দিলেন জানিনা। পরে কানাঘুষোয় শুনেছিলাম পারিবারিক কারণে নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়ীর লোকে ওনাকে মানসিক রুগীদের হাসপাতালে ভরতি করিয়েছিল এবং উনি সম্ভবত ওখান থেকে কোথাও চলে গেছিলেন। অবিবাহিত প্রভা দিদিমনিকে আমরা সবাই খুব মনে করতাম। পরে সময়ের সাথে তিনিও ধূসর পান্ডুলিপিতে ছবি হয়ে ছিলেন। আজ সেই পান্ডুলিপির ধূসর পাতা খানিকটা ধূলো উড়িয়ে জানান দিলো, যে, আমি আছি।আমরা চিনলেও উনি কিন্তু আমাদের চিনতে পারলেন না। ওনার স্মৃতি, ওনার
বোধ, ওনার চিন্তা, পারিপার্শ্বিকতা আর কোনদিনই বর্তমানে ফিরবে না।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফেরত এলাম। আঁখিকে বললাম, দিদিমনির খরচাটা আমিই
  দেবো। অন্য কারো কাছ থেকে নেবার দরকার নেই। আমার পক্ষে তো আর থাকা সম্ভব নয়, আমার হয়ে আঁখিই যেন যা যা করনীয় সেটা করে আমায় খবর দেয়।

আমি গুরুদক্ষিণা দেবো ভাবলেই তো হল না, হয়ত গুরুদক্ষিণা দেবার যোগ্যতাও
সবার থাকে না।অন্তত আমার হয়তো নেই, ফেরার পথে রাস্তাতেই মোবাইলে আঁখির থেকে শেষখবরটা পেয়ে গেলাম।

এবার থেকে আমি জোৎস্নারাতে বৃষ্টি নামলেই জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার মাঝে
টিপটিপ বৃষ্টি নামা দেখবো। কারন আমি জানি ভরা জ্যোৎস্নায় কোনো অপূর্ণতা থাকে না।
 
 

রত্নদীপা দে ঘোষ


এক সন্ধ্যা

দুপুরের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আচমকা আওয়াজে। ঘুম এতো গভীর ছিল যে কিছুক্ষণ দেবারতি বুঝতে পারলেন না এখন সকাল না বিকেল। অতঃপর মন ফিরলো নিজ নিকেতনে। ঘড়ির দিকে চোখ। বিকেল চারটে বাবুই আর পিয়ালি অফিসে। নীচের তলায় সম্ববত নতুন ভাড়াটেরা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সকাল বেলাতেই ওদের মালপত্র এসে গিয়েছিল।

আসলে বাবুই আর পিয়ালি দুজনেই অ্যামেরিকা চলে যাচ্ছে। তাই নীচের তলাটা ভাড়া দেওয়া। বাবুই ঘ্যামা একটা জব পেয়েছে মেরিল্যান্ডে। এমনি ভাষা বাবুই পাখির। পিয়ালি এখনো কিছু পায়নি। তবে একবার সেখানে গিয়ে পড়তে পারলে পেতে কতক্ষণ। সমস্ত প্ল্যান বাবুই নিজেই ঠিক করেছে মায়ের জন্য, বাড়ীর জন্য নিজেদের জন্যতার একদম ইচ্ছে নয় যে তারা দুজনে চলে যাবার পর মা এই দোতলা বাড়ীতে একলা থাকুক। দেবারতি বহু পুরানো অ্যাস্থমা রুগী। তাছাড়া প্রেসার ও হাই এর দিকেবাবুই নিজেই ওল্ড হোমের আইডিয়াটা দিলো। এসব গত তিন মাস আগেকার ঘটনা। বাবুইরা নিজেরা দুজনে অনেক ওল্ড হোম ঘুরেছে কথা বার্তা বলেছে অবশেষে গোটা তিন চার ফাইনাল করে মায়ের দরজায় হানা। মায়ের থাকবার জায়গা মায়ের পছন্দ মতই হবে।

একটা রোববার দেখে তিনজনে বেরলেন। প্রথমটার নাম আশালতা। বেশ বড়ো, তিনতলা, একটু প্রাচীন গন্ধ। এই গন্ধটাই দেবারতির পছন্দ হোলো নানিজেকে পুরনো মানুষ ভাবতে তিনি রাজি হলেন না। নাম্বার টুটা জাস্ট ফাটাফাটি । বাবুইর মতে । পিয়ালির ভাল লাগ্ল ঘরের লাগোয়া ব্যালকণিটা । একদম এইটুকু । আর ঘরটার রঙ হাল্কা নীল । দেবারতির মনে হোলো ঠিক এই রকম একটা নীল রঙ কোথায় যেন ...একটু শীত , শালটা টেনে নিলেন গায়ে । দেবারতি এই বৃদ্ধাবাসটি পছন্দ করলেন

নীচের তলায় আসবাবপত্র টানাটানির আওয়াজ হচ্ছে , কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে । বসবার ঘরে টিভিটা অন করে এক কাপ চা । রোজগেরে গিন্নী প্রোগ্রামটা এই সময় প্রতিদিন দেখেন দেবারতি । একটু পরেই রান্নার ছেলেটি আসবে । আজ বাবুইরা পার্টি তে যাবে , রাত হবে ফিরতে ওদের । সবে নতুন গিন্নীর সাথে আলাপ হোলো কি হোলো না বেল বাজলো । দরজা খুলে দেখলেন বাচ্চা একটি মেয়ে এই বছর পাঁচ বয়েস আর সম্ভবত সাথে ওর মা । তার বয়েস মনে হয় পিয়ালির মতই ।
নমস্কার , আমরাই নীচের তলায় এসেছি । আমার নাম মল্লিকা আর এ আমার কন্যা ধানসিঁড়ি । আপাতত আমরা তিনজন থাকবো , দিন কুড়ির মধ্যে আমার বাবাও এসে যাবেন । চার জনের সংসার আমাদের , আমরা দু বোন , বাবা কখনো দিদির বাড়ী কখনো আমাদের সাথে থাকেন দেবারতি বাচ্চাটার গাল টিপে দিলেন । মা মেয়ে দুজনেই খুব বকবকে । কি মিষ্টি মেয়ে তোমার আর নামটাও ভারি সুন্দর রেখেছ... তোমরা যখন বাড়ী দেখতে এসেছিলে তখন আমি হরিদ্বারে ছিলুম বোনের বাড়ীতে , তাই দ্যাখা হয়নি আগে ।
হুম। মল্লিকা বললো , তাই তো আলাপ করতে এলুম । আপনিও তো চলে যাচ্ছেন ... হু, যাচ্ছি বৃদ্ধাবাসে । দেবারতি হাস্লেন , আসলে আমার ছেলে পছন্দ করছে না আমি বাড়ীতে একলা থাকি , আমি অনেক বোঝালুম যে নীচেও তো লোকজন থাকছে ... কিন্তু ছেলে রাজী হোলো না , আসলে আমার শরীরটাও ভালো যায়না তেমন ... বৃদ্ধাবাসে অনেকের মাঝখানে থাকা , কথাবার্তা আড্ডা এগুলো জরুরি তাছাড়া নিয়মিত ডাক্তারের চেক আপের ব্যবস্থাও আছে সেখানে ......ছেলে মেয়ে বড়ো হয়ে গেলে তাদের কথা শুনেই চলতে হয় ।
মল্লিকা বললো , কিন্তু থাকলে ভালো লাগতো আমাদেরও , দেবাশিস তো বেশীর ভাগ সময় ট্যুরেই থাকে , আমি বাবা আর মেয়ে । সুধাংশুর ছবিতে চোখ আটকেছে মল্লিকার । দেবারতি কবে ছেড়ে এসেছেন পঁয়তাল্লিশ । কিন্তু মেহগিনি ফটোফ্রেমে সুধাংশু এখনও চল্লিশ , ঝকঝকে যুবক । চশমার ফ্রেম আঁচলে মুছলেন দেবারতি , তোমার মেশোমশাই , আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বহু বছর ।
মল্লিকাও বিষণ্ণ হোলো , আমার মাও অনেকদিন চলে গেছেন । আমার বাবাকে আপনি চিনলেও চিনতে পারেন । বাবা নতুন চাকরি পেয়ে যখন কলকাতায় আসেন তখন এ পাড়াতেই কোথাও ভাড়া থাকতেন । আমরা এখানে আসছি শুনেই বাবা খুব খুশি , বললেন সেকিরে , আমারি পুরনো পাড়া ...
আজ আসি মাসীমা ... পরে আবার আসবো । দেবারতি বললেন , এসো আবার বরকে , বাবাকেও নিয়ে এসো ... তোমার বাবার নাম কি ? নিখিল প্রামানিক ... মল্লিকার মেয়ে ছুটছে ... মল্লিকাও

একতলার ঘরের রঙ তখন ছিলো নীল । আজকেই সুধাংশুর রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন কি ভাগ্যিস সুধাংশুর অপেক্ষা না করে দেবারতি একলাই গিয়েছেন রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে । চেম্বারে বসে কাঁপছেন দেবারতি ... চোখের দিকে তাকিয়ে ডঃ সেন বলছেন , আপনারা অন্য কিছু ভাবুন না ... অ্যাডপ্ট করতে পারেন ... বা অন্য কিছু ... রাতে সুধাংশুর বুকে হাত রাখলেন দেবারতি । থ্যাঙ্ক গড , আমরা দুজনেই একদম নর্মাল ... আমার মন বলছে ... দেখো হয়তো সামনের মাসেই ...

পরের মাসে সুধাংশু তখন ট্যুরে । রাত নটা নাগাদ একতলায় । কলিং বেলে হাত রাখলেন দেবারতি । ঘরময় নীল , ব্যাচেলারস ডেন । অগোছালো শার্ট প্যান্ট আন্ডার গারমেন্ট ছড়ানো বিছানায় ... দেবারতি হাত রাখলেন নিখিলের ডেনিমে ... আঃ এতো নীল কেনো ...

বাবুইপাখি অবশ্য খুব ফর্সা , নীল শিরাগুলো উঁকি দ্যায় কখনো চামড়ার ফাঁক দিয়ে ।লোকে বলে ছেলে নাকি সুধাংশুর রঙ পেয়েছে আর নাক চোখ দেবারতির ।

বৃদ্ধাবাসে যাবার বেশী দিন বাকি নেই । টুকটাক জিনিসপত্র এরই মধ্যে গুছিয়ে ফেলেছিলেন দেবারতি , পছন্দের শাড়ি , গল্পের বই , অতুলপ্রসাদের সিডি ... নিজের বিয়ের একটা ছবি , বাবুই আর পিয়ালিরও
খুব দ্রুত দেবারতি জায়গার জিনিস সব জায়গামত গুছিয়ে রাখলেন ... বই, শাড়ি সিঁদুরদানের ফটোটাও বেরোলো অ্যামেরিকান ট্যুরিস্টার থেকে ... আঁচলে ছবিটা একবার মুছে শোবার ঘরের ছোট টিভির মাথায় রেখে দিলেন যেন আর কোত্থাও আর যাবার নেই তার ।

ছোট থেকেই সব্বাই জানে দেবারতি খুব গোছানো স্বভাবের মানুষ ।