কবিতার পরিবারের একমাত্র ব্লগজিন

এখনও পর্যন্ত  Website counter  জন ব্লগটি দেখেছেন।

শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৩

ভ্রমণ - রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য

পুরীর রথ
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য



বাঙালির প্রিয় জায়গা হলো পুরী । ওডিশার ( সরকারী ভাবে এখন এই নাম ) বঙ্গপোসাগরের ধারে এই শহরটিতে গেলে একসঙ্গে রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই হয় ।

যাওয়াটাও খুব একটা হ্যাপার নয় । হাওড়ায় গিয়ে প্রায় গোটা পাঁচ – ছয়েক ট্রেনের মধ্যে একটাতে চেপে পড়লেই হলো ।

হোটেলের খুব একটা সমস্যা নেই । তবে, রথের সময় কিন্তু ভারী মুশকিল । আগে থেকে ঠিক না করে গেলে মুশকিল ।

এবারে এই রথযাত্রা সম্বন্ধে কিছু জেনে নেই আমরা ।

রথযাত্রা আর্যজাতির একটি প্রাচীন ধর্মোৎসব। কিন্তু এখন রথযাত্রা বললে সাধারণত জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বোঝায়। কিন্তু একসময় ভারতবর্ষে সৌর, শক্তি, শৈব, বৈষ্ণব, জৈন, বৌদ্ধ সব ধর্ম-সম্প্র্রদায়ের মধ্যে স্ব স্ব উপাস্যদেবের উৎসববিশেষে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো।


প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ এবং পদ্মপুরাণে রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ কেমন হবে, সে সম্পর্কে বলা আছে। বিষ্ণুধর্মোত্তরে একই রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা—এই তিনটি মূর্তি স্থাপন নির্দেশ থাকলেও পুরুষোত্তম মাহাতো ও নীলাদ্রি মহোদয়ের পদ্ধতি অনুসারে পুরীধামে আজ পর্যন্ততিনজনের জন্য তিনটি বৃহৎ রথ প্রস্তুত হয়ে থাকে।
রথযাত্রার প্রচলন ঠিক কোন সময়ে হয়, তা এখনো স্থিরনিশ্চিত হয়নি। কারও কারও মতে, বুদ্ধদেবের জন্মোৎসব উপলক্ষে বৌদ্ধরা যে রথযাত্রা উৎসব করত, তা থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রার উৎপত্তি। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, ভারতে প্রতিমাপূজা প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে রথযাত্রার উৎসব প্রচলিত হয়।
উৎকলখণ্ড এবং দেউলতোলা নামক ওডিশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, সত্যযুগে অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্র নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্র পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

বৌদ্ধযুগেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার অনুরূপ রথে বুদ্ধদেবের মূর্তি স্থাপন করে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা হিয়ান খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটানে স্থানে, যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন, তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ত্রিশ ফুট উঁচু চার চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রত্ন, অলংকার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হতো। রথটির চারপাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হতো বুদ্ধদেবের মূর্তি। এরপর সে দেশের রাজা তাঁর মুকুট খুলে রেখে খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হতো। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও আমরা দেখে থাকি যে প্রতিবছর রথযাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশপরম্পরাক্রমে পুরীর রাজপরিবারের নিয়মানুযায়ী যিনি রাজা উপাধিপ্রাপ্ত হন, তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর পরপর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে। শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।


তবে সূর্য-রথই যে সব রথের প্রথম, তা পুরাণে বলা আছে।
পূর্বে ভারতীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার অনুষ্ঠান হতো। বৌদ্ধ প্রভাবকালে তা বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হিন্দুধর্মের পুনরুদ্ভবকালে উৎকলবাসীর মনোরঞ্জনের জন্য সেই সময়েই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রচলিত হলো। এই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা ক্রমে সর্বত্র প্রচলিত হলে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার বিষয় অনেকেই ভুলে গেল। তবে হিমালয়ের কোনো কোনো স্থানে দেবীর রথযাত্রার কথা এখনো শোনা যায়। নেপালে কি বৌদ্ধ, কি শৈব সর্বসাধারণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা প্রচলিত আছে।
পুরীর সমুদ্রকেও ছাপিয়ে ওঠে রথের মেলার জনসমুদ্র।
পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা অনুষ্ঠান শুরু করে শুক্লা একাদশীর দিন পূর্ণযাত্রা বা উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হবার কথা। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রাও প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদিও আষাঢ় মাসের পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতি বছর তো আর পুষ্যানক্ষত্রের সঙ্গে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির যোগ হয় না, তাই কেবল ওই শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা শুরু হয়ে থাকে। তবে কখনও এই তিথির সঙ্গে পুষ্যানক্ষত্রের যোগ হলে সেটি হয় একটি বিশেষ যোগ-সম্পন্ন রথযাত্রা ।

পুরীর রথযাত্রা উৎসব হচ্ছে বড় ভাই বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন যাত্রার স্মারক। তিন জনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ। রথযাত্রা উৎসবের মূল দর্শনীয় হল এই রথ তিনটি। প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। তারপর সুভদ্রা পরে জগন্নাথ ।

বলভদ্রের রথের নাম:- তালধ্বজ্ ।

সুভদ্রার রথের নাম:- দেবদলন।

জগন্নাথের রথের নাম:- নন্দিঘোষ।



রথগুলির বর্ণনা:-



তালধ্বজ্ (বলভদ্র/বলরাম) -

উচ্চতা- ১৩.২ মিটার।

কাঠের টুকরো-৭৬৩ টি।

ধ্বজার/পতাকার নাম- উন্মনী।

রথের কাপড়ের রং- লাল সবুজ।

চাকা-১৬ টি।



দেবদলন (সুভদ্রা) -

উচ্চতা-১২.৯ মিটার।

কাঠের টুকরো-৫৯৩টি।

ধ্বজার/পতাকার নাম- নাদম্বিক।

রথের কাপড়ের রং- লাল কালো।

চাকা-১৪ টি।



নন্দিঘোষ (জগন্নাথ) -

উচ্চতা- ১৩.৫ মিটার।

কাঠের টুকরো- ৮৩২ টি।

ধ্বজার/পতাকার নাম- ত্রৈলোক্যমোহিনী।

রথের কাপড়ের রং- লাল হলুদ।

চাকা-১৮ টি।

রথ তিনটি সমুদ্রোপকূলবর্তী জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সেখানে সাত দিন থাকার পর আবার উল্টোরথ অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দিরে ফিরে আসা। এখন তিনটি রথ ব্যবহৃত হলেও আজ থেকে সাতশো বছর আগে রথযাত্রার যাত্রাপথ দুটিভাগে বিভক্ত ছিল। আর সেই দুটি ভাগে তিনটি-তিনটি করে মোট ছটি রথ ব্যবহৃত হত। কেননা সে সময় জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচা আসার পথটির মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক প্রশস্ত নালা। নাম ছিল বলাগুণ্ডি নালা। তাই জগন্নাথ মন্দির থেকে তিনটি রথ বলাগুণ্ডি নালার পার পর্যন্ত এলে পরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি রথ থেকে নামিয়ে নালা পার করে অপর পারে অপেক্ষমাণ অন্য তিনটি রথে বসিয়ে ফের যাত্রা শুরু হত। ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা কেশরী নরসিংহ পুরীর রাজ্যভার গ্রহণের পর তাঁর রাজত্বকালের কোনও এক সময়ে এই বলাগুণ্ডি নালা বুজিয়ে দেন। সেই থেকে পুরীর রথযাত্রায় তিনটি রথ।





এবারে আসা যাক, নব কলেবর প্রসঙ্গে। যে নিম গাছগুলি থেকে বিগ্রহগুলির নবকলেবর হবে; সেগুলির কতকগুলি বৈশিষ্ট্য থাকবে। ১) নিমগছের রং ঘন কালো হবে।

২) এই গাছের কাণ্ডের ব্যাস কম করে ১২ ফুট হবে।

৩) এক একটি গাছের ৪ টি প্রধান শাখা থাকবে।

৪) গাছগুলি কোন নদী বা পুকুরের পাশে থাকবে। গাছগুলিকে ৩টি রাস্তার সংযোগস্থলে খুঁজে পেতে হবে।

৫) গাছগুলি বরুণগাছ ও বেলগাছ দ্বারা পরিবৃত থাকবে।

৬) গাছগুলি ৩টি পাহাড় দ্বারা পরিবৃত থাকবে।

৭) নিমগাছের কাছেই কোন আশ্রম থাকবে।

৮) একটি শ্মশান ভূমিও থাকবে।

৯) ভগবান বিষ্ণুর ৪টি পবিত্র চিহ্ন – শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মের ছাপ থাকবে গাছের কাণ্ডে।

১০) নিমগাছের কাছেই উইপোকার ঢিবি থাকবে।

১১) পাখীর কোন বাসা থাকবে না গাছে।

১২) নিমগাছের ওপর কোনদিন বাজ পড়া চলবে না। ঝড়ে, নিমগাছের কোন শাখা প্রশাখা ভাঙ্গা চলবে না।

১৩) নিমগাছের নীচে গোখরো সাপের বাসা থাকতে হবে।

১৪) নিমগাছের নীচে কোন ঝোপঝাড় থাকা চলবে না।

এই ১৪ টি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কম করে ৫ টি বৈশিষ্ট্য থাকলেই নবকলেবরের জন্য সেই নিমগাছ নির্বাচন করা হবে।





সরকারী রেকর্ডে ১৭৩৩ খ্রীষ্টাব্দ থেকে নবকলেবরের নথীভূক্তকরণ আছে। তারপর ১৮০৯,১৮২৮,১৮৫৫,১৮৭৪,১৮৯৩,১৯১২,১৯৩১,১৯৫০,১৯৬৯,১৯৭৭,১৯৯৬ পর্যন্ত আছে।

উৎস:- আমার পুরীতে কর্মরত অবস্থায় পুরীর পাণ্ডা বন্ধুদ্বয়; শ্রী বনবিহারী পতি ও শ্রীবিপিন পতি, পুরীর সরকারী গেজেট ও শারদীয় “বর্তমানে” প্রকাশিত শ্রী সুমন গুপ্তের প্রবন্ধ ও মণীশ সিংহ রায় আনন্দবাজার পত্রিকা।

তাহলে পরের বার চলুন, বেড়িয়ে পড়া যাক পুরীর উদ্দেশ্যে ।

1 টি মন্তব্য:

  1. এই তথ্যবহুল লেখা সমৃদ্ধ করলো। অনেক অজানা তথ্য জানিয়ে দিলেন ঘনাদা।

    উত্তর দিনমুছুন